মহাকর্ষের প্রকৃতি এবং এটি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সঙ্গে একীভূত করা সম্ভব কি না—তা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম বড় রহস্য। বেশিরভাগ গবেষকের মতে, মৌলিক স্তরে মহাবিশ্বের সব ঘটনাই কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের নীতির অনুসারী, কিন্তু এই নীতিগুলো প্রচলিত মহাকর্ষ তত্ত্বের (গ্র্যাভিটির) সঙ্গে মেলে না।
বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীরা এমন পরীক্ষা প্রস্তাব করেছেন যা দেখাতে পারে, মহাকর্ষ কি কোয়ান্টাম এনট্যাংগেলমেন্ট নামের একটি ঘটনা সৃষ্টি করতে পারে কি না। কিন্তু সম্প্রতি দুইজন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী এক জটিল ও আপাতদৃষ্টিতে অস্বাভাবিক ধারণা উপস্থাপন করেছেন। তাদের মতে, মহাকর্ষ নিজে কোয়ান্টাম না হয়েও কোয়ান্টাম প্রভাব দেখাতে পারে।
এনট্যাংগেলমেন্ট ঘটে যখন দুটি বস্তু একটি অভিন্ন কোয়ান্টাম অবস্থায় থাকে, অর্থাৎ একটির কোনো ধর্ম পরিমাপ করলে অন্যটির ফলাফলও নিখুঁতভাবে জানা যায়। আগের গবেষণাগুলো বলেছিল, যদি দুটি কোয়ান্টাম বস্তুকে তাদের পারস্পরিক মহাকর্ষীয় আকর্ষণের মাধ্যমে জড়িত করা যায়, তাহলে মহাকর্ষ নিজেও কোয়ান্টাম প্রকৃতির হতে হবে।
কিন্তু ২২ অক্টোবর Nature জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে লন্ডনের রয়্যাল হলোওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রিচার্ড হাওল এবং জোসেফ আজিজ বলেন, এই ব্যাখ্যাটি অতিরিক্ত সরলীকৃত।
তারা তাদের গবেষণায় আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার সরলীকৃত সংস্করণের ভিত্তিতে দুটি ভরের পারস্পরিক ক্রিয়া গণনা করেন। তবে তারা কাজ করেছেন প্রচলিত কোয়ান্টাম মেকানিক্সে নয়, বরং কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি-র কাঠামোর মধ্যে যেখানে পদার্থসহ সবকিছুই একটি কোয়ান্টাম ক্ষেত্রের মধ্যে তরঙ্গ আকারে প্রসারিত হয়। যেমন, আলোক কণিকা বা ফোটন হলো ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডের তরঙ্গ, তেমনি ইলেক্ট্রন হলো ‘ইলেক্ট্রন ফিল্ড’-এর তরঙ্গ।
গবেষকরা আগেই দেখিয়েছেন যে, আইনস্টাইনের মহাকর্ষ ক্ষেত্র নিজে এনট্যাংগেলমেন্ট তৈরি করতে পারে না। কিন্তু আজিজ ও হাওল বলেন, দুটি ভর পরস্পরের সঙ্গে ক্রিয়া করে শুধু মহাকর্ষ ক্ষেত্রের মাধ্যমেই নয়, বরং সব ধরনের ‘ম্যাটার ফিল্ড’ (যেমন ইলেক্ট্রন ফিল্ড) এর মাধ্যমেও, যা এনট্যাংগেলমেন্ট সৃষ্টি করতে সক্ষম।
হাওলের ভাষায়, “যখন আমরা মহাকর্ষীয় ক্রিয়াকে আরও বিস্তৃতভাবে দেখি, তখন দেখা যায়, ক্লাসিক্যাল ক্রিয়াগুলোও এনট্যাংগেলমেন্ট তৈরি করতে পারে।”
লন্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী জোনাথন ওপেনহাইম এই ব্যাখ্যায় পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। তিনি বলেন, যদিও লেখকরা দেখিয়েছেন যে মহাকর্ষ ‘ম্যাটার ফিল্ড’-এর আচরণে ভূমিকা রাখে, আসলে জড়িতাবস্থাটি তৈরি করছে কোয়ান্টাম পারস্পরিক ক্রিয়া, মহাকর্ষ নয়। তবুও তিনি স্বীকার করেন, “এই গবেষণাটি একটি আকর্ষণীয় দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছে যা আলোচনার জন্ম দেবে।”
অন্য এক পদার্থবিজ্ঞানী, যিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বলেন, যদি এনট্যাংগেলমেন্টের কারণ হয় ম্যাটার ফিল্ড, আর মহাকর্ষ ক্ষেত্র নয়, তাহলে একে মহাকর্ষের প্রভাব বলা “শুধুই শব্দের খেলা”।
স্বল্পমেয়াদে এই তত্ত্ব পরীক্ষামূলক গবেষণায় বড় প্রভাব ফেলবে না, এ বিষয়ে সবাই একমত। হাওল ও আজিজের গণনা অনুযায়ী, আইনস্টাইনের ক্লাসিক্যাল মহাকর্ষের মাধ্যমে দুটি ভরের মধ্যে যে এনট্যাংগেলমেন্ট তৈরি হয়, তার শক্তি অনেক দুর্বল। যদি মহাকর্ষ সত্যিই কোয়ান্টাম হতো, তবে জড়িতাবস্থা অনেক বেশি শক্তিশালী হতো।
ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষামূলক পদার্থবিজ্ঞানী মার্কুস অ্যাসপেলমায়ার বলেন, যদি ভবিষ্যতের পরীক্ষাগুলোতে কোয়ান্টাম এনট্যাংগেলমেন্ট শনাক্ত করা যায়, তাহলে তা হবে প্রমাণ যে মহাকর্ষ আসলেই কোয়ান্টাম প্রকৃতির, এবং আইনস্টাইনের তত্ত্বকে নতুন তত্ত্ব দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে হবে।
অ্যাসপেলমায়ার আরও বলেন, এই গবেষণা স্মরণ করিয়ে দেয় যে মহাকর্ষের সমস্যা অত্যন্ত সূক্ষ্ম, এবং পরীক্ষার ফলাফল ব্যাখ্যা করার সময় গবেষকদের ‘অঘোষিত অনুমান’-এর ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। সত্যিকার অর্থে কোয়ান্টাম মহাকর্ষ প্রদর্শন করতে হলে এমন এক পরীক্ষা করতে হবে যার ফলাফল “বর্তমান ক্লাসিক্যাল মহাকর্ষ তত্ত্ব দিয়ে আর ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।” তার কথায়, “এটাই আমরা সবাই করতে চাই।”
———
Classical theories of gravity produce entanglement. Nature (2025).
DOI: 10.1038/s41586-025-09595-7
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


