১৮১২ সালে মস্কো থেকে পশ্চাদপসরণের সময়, সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট প্রথম তাঁর বিশাল সেনাবাহিনীর অধিকাংশকে হারান ক্ষুধা, অসুখ আর ভয়াবহ রাশিয়ান শীতের কারণে। এখন, সেই নিহত সৈন্যদের ডিএনএ বিশ্লেষণে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন আরও দুটি অপ্রত্যাশিত রোগ, যা তাদের ভোগাচ্ছিল।
গবেষকরা জানিয়েছেন, সেনাবাহিনীর ধ্বংসের পেছনের কারণগুলো সম্ভবত আগের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি জটিল। “ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে এই গবেষণাপত্রটি হবে খুবই আকর্ষণীয়,” বলেন অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির নৃতাত্ত্বিক জেনেটিসিস্ট অ্যান স্টোন। “গবেষণাটি অসাধারণভাবে সম্পন্ন হয়েছে।”
ইতিহাসবিদরা বহুদিন ধরে তর্ক-বিতর্ক করে আসছেন নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীর পতনের কারণ নিয়ে। ২০০৬ সালে, মৃত সৈন্যদের হাড়গোড়ের ডিএনএ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা খুঁজে পান দুটি রোগজীবাণু, Rickettsia prowazekii (যা টাইফাস ঘটায়) এবং Bartonella quintana (যা ট্রেঞ্চ জ্বর ঘটায়)। ইতিহাসে উল্লেখিত উপসর্গ এবং সৈন্যদের দেহে পাওয়া উকুন (যা টাইফাস ছড়ায়) দেখে এই দুই জীবাণুকে তখন থেকেই প্রধান সন্দেহভাজন মনে করা হতো।
তবে এই শনাক্তকরণ করা হয়েছিল পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন (PCR) পদ্ধতি ব্যবহার করে, যা নির্দিষ্ট জীবাণুর ডিএনএ শনাক্ত করতে পারদর্শী হলেও, অজানা রোগ সনাক্তকরণের ক্ষেত্রে ততটা কার্যকর নয়।
২০ বছর পর, প্যারিসের পাস্তুর ইনস্টিটিউটের প্যালিওজিনোমিস্ট নিকোলাস রাসকোভান ও তাঁর দল এই রহস্যে ফেরেন আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে। এবার তাঁরা প্রাচীন ডিএনএ থেকে যেকোনো পরিচিত জীবাণুর সন্ধান করতে সক্ষম এমন একটি নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করেন।
২০০২ সালে লিথুয়ানিয়ায় খনন করা ১৩ জন সৈন্যের দাঁত থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করে তাঁরা ‘নেক্সট-জেনারেশন সিকোয়েন্সিং’ প্রযুক্তি প্রয়োগ করেন, যা একসঙ্গে লক্ষাধিক ডিএনএ অংশ বিশ্লেষণ করতে পারে। এতে তাঁরা একাধিক রোগজীবাণুর উপস্থিতি পরীক্ষা করতে সক্ষম হন।
১৩ জনের মধ্যে ৪ জনের শরীরে পাওয়া যায় Salmonella enterica, যা প্যারাটাইফয়েড জ্বর ঘটায়। এই জ্বরের উপসর্গের মধ্যে থাকে ক্ষুধামন্দা ও গোলাপি দাগ। আরও ২ জনের শরীরে পাওয়া যায় Borrelia recurrentis নামক জীবাণু, যা উকুনবাহিত এবং “রিল্যাপসিং ফিভার” বা পুনরাবৃত্ত জ্বর ঘটায়, যেখানে উচ্চ তাপমাত্রার জ্বর বারবার ফিরে আসে।
দলটি ২০০৬ সালে শনাক্ত করা রোগগুলোর কোনো চিহ্ন খুঁজে পায়নি। সম্ভবত সেই জীবাণুগুলো এই ১৩ জন সৈন্যের মধ্যে ছড়ায়নি, অথবা নতুন প্রযুক্তি কিছু ক্ষেত্রে পিসিআর-এর চেয়ে কম সংবেদনশীল হওয়ায় সেগুলো ধরা পড়েনি।
তবে গবেষক রাসকোভান বলেন, ফলাফল স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে সেনাবাহিনীর পতনের পেছনে “একক কোনো মহামারি” ছিল না। বরং “বহু ধরনের কারণেই” সৈন্যদের মৃত্যু ঘটেছিল এবং হয়তো আরও অনেক কারণ রয়েছে, যা এখনো অজানা।
রাসকোভান পরামর্শ দেন, বাকি কারণ নির্ণয়ে বিজ্ঞানীদের আপাতত বিরতি নেওয়া উচিত। লিথুয়ানিয়ার খননকৃত অধিকাংশ দাঁতের নমুনা ইতিমধ্যে বিশ্লেষিত হয়েছে। তিনি বলেন, “এখন যা অবশিষ্ট আছে, তা ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়া ভালো, যখন আমাদের হাতে থাকবে এমন প্রযুক্তি, যা দিয়ে আমরা আজ কল্পনাও করতে পারছি না এমন কিছু জানতে পারব।”
———
Paratyphoid fever and relapsing fever in 1812 Napoleon’s devastated army. Current Biology (2025).
DOI: 10.1016/j.cub.2025.09.047
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


