ল্যামা ও আলপাকার অ্যান্টিবডি ব্যবহার করে তৈরি একটি নতুন অ্যান্টিভেনম বিশ্বের কিছু বিষধর সাপের বিষ নিস্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছে। এমনটাই জানিয়েছে Nature জার্নালে প্রকাশিত এক সাম্প্রতিক গবেষণা। ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, এই অ্যান্টিভেনম আফ্রিকার ১৭টি বিষধর সাপের টক্সিনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রদান করেছে এবং বিষের কারণে সৃষ্ট ত্বকের ক্ষতও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে।
সাপের কামড় আফ্রিকার সাব-সাহারান অঞ্চলে এক উপেক্ষিত জনস্বাস্থ্য সমস্যা। সেখানে প্রতিবছর প্রায় ২০,০০০ মানুষ সাপের কামড়ে মারা যায়, আর বছরে প্রায় ৩ লক্ষ সাপের কামড়ের ঘটনা ঘটে। বিষে টিস্যু নষ্ট হয়ে প্রায় ১০,০০০ মানুষের অঙ্গচ্ছেদ করতে হয়।
বর্তমানের অ্যান্টিভেনম তৈরিতে সাধারণত ঘোড়াকে অল্পমাত্রার সাপের বিষ ইনজেকশন দেওয়া হয়। ঘোড়ার শরীরে বিষের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, যা পরে তার রক্তের প্লাজমা থেকে সংগ্রহ করে মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। তবে এই অ্যান্টিভেনম সাধারণত নির্দিষ্ট এক প্রজাতির সাপের জন্যই কার্যকর।
গবেষণার সহ-লেখক ডেনমার্কের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির বায়োইঞ্জিনিয়ার আনে ল্যুংগারস বলেন, “অনেক সময় কামড় দেওয়া সাপের প্রজাতি শনাক্ত করা কঠিন হয়, যার ফলে সময়মতো সঠিক চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।”
ঘোড়ার প্লাজমায় থাকা অ্যান্টিবডি ও অন্যান্য প্রোটিন মানুষের দেহে ‘ফরেইন অবজেক্ট’ হিসেবে শনাক্ত হয় এবং অনেক সময় ইমিউন সিস্টেমে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তাছাড়া প্রচলিত অ্যান্টিভেনম সাধারণত সাপের কামড়ে সৃষ্ট লোকাল টিস্যু ক্ষয় রোধ করতে পারে না।
বিস্তৃত কার্যকারিতার অ্যান্টিভেনম তৈরির জন্য গবেষকেরা এক আলপাকা ও এক ল্যামাকে সাব-সাহারান আফ্রিকার ১৮টি ভয়ংকর ইল্যাপিড সাপের (যেমন কোবরা, মাম্বা ও রিংখাল) বিষের সংস্পর্শে আনেন। এরপর তারা উটজাত প্রাণীদের দেহ থেকে ‘ন্যানোবডি’ (অ্যান্টিবডির ছোট সংস্করণ যা সহজে টিস্যুতে প্রবেশ করে এবং টক্সিনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে) আলাদা করেন। এই ন্যানোবডির মধ্যে আটটি মিলে তৈরি করা হয় একটি একক অ্যান্টিভেনম ককটেল।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, বিষ ইনজেকশন দেওয়া ইঁদুরকে এই নতুন রিকম্বিন্যান্ট অ্যান্টিভেনম দিলে ১৮টির মধ্যে ১৭টি সাপের বিষ সম্পূর্ণভাবে নিস্ক্রিয় হয়। তাছাড়া এটি বিষজনিত ত্বকের ক্ষতও উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়, যা বর্তমানে ব্যবহৃত Inoserp PAN-AFRICA অ্যান্টিভেনমের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর।
আগে মনে করা হতো, বহুবিধ সাপের বিষ প্রতিরোধে একটি বিস্তৃত অ্যান্টিভেনম তৈরি করতে অগণিত অ্যান্টিবডি প্রয়োজন হবে, কারণ কিছু সাপের বিষে প্রায় ১০০ ধরনের টক্সিন থাকতে পারে। কিন্তু এই গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র আটটি ন্যানোবডির সমন্বয়েই বহু সাপের বিষ নিস্ক্রিয় করা সম্ভব। এতে বোঝা যায়, একই ধরনের অ্যান্টিভেনম অন্যান্য উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের সাপের জন্যও তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে সাপের কামড় একটি বড় সমস্যা।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, তাদের তৈরি ন্যানোবডি-ভিত্তিক অ্যান্টিভেনম দ্রুত ভেঙে যায় এবং বড় প্রাণীর শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব নাও রাখতে পারে।
যুক্তরাজ্যের ব্যাংগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী আনিতা মালহোত্রা বলেন, “অল্প সংখ্যক রিকম্বিন্যান্ট অ্যান্টিবডি দিয়ে এত প্রজাতির সাপের বিষ নিস্ক্রিয় করা সত্যিই আশাব্যঞ্জক।” তিনি আরও বলেন, এই অ্যান্টিভেনমের টিস্যু ক্ষয় কমানোর ক্ষমতাও উল্লেখযোগ্য।
তার মতে, “সাপের কামড়ে প্রাণ বেঁচে গেলেও হাত-পা হারানো বা অঙ্গ অচল হয়ে যাওয়ার মতো ফলাফল প্রায়ই দেখা যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ প্রভাব ফেলে, এই নতুন অ্যান্টিভেনম সে সমস্যাও কমাতে পারবে।”
———
Nanobody-based recombinant antivenom for cobra, mamba and rinkhals bites. Nature (2025).
DOI: 10.1038/s41586-025-09661-0
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


