বিশ্বের বৃহত্তম স্থলজ প্রাণী হাতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে গবেষকরা তৈরি করেছেন বিশ্বের ক্ষুদ্রতম থ্রিডি (3D) বায়োপ্রিন্টার। এই যন্ত্রটির প্রিন্টহেডের প্রস্থ মাত্র ২.৭ মিলিমিটার, যা একটি দীর্ঘ, নমনীয় বাহুর প্রান্তে যুক্ত থাকে এবং সেটি হাতির শুঁড়ের মতো নড়ে। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি অস্ত্রোপচারের পর শরীরে নিরাময়-সহায়ক হাইড্রোজেল পৌঁছে দিতে চিকিৎসকদের সাহায্য করতে পারে।
গত ২৯ অক্টোবর, ২০২৫ Device জার্নালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে গবেষকরা দেখিয়েছেন, এই বায়োপ্রিন্টারটি চিকিৎসকের সার্জিক্যাল স্কোপের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করিয়ে কৃত্রিম স্বরযন্ত্রে (vocal cords) হাইড্রোজেল স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ইব্রাহিম ওজবোলাট বলেন, “এই প্রথম আমি এমন কোনো বায়োপ্রিন্টার দেখলাম যা সরাসরি স্বরযন্ত্রে প্রয়োগযোগ্য। সাধারণত বায়োপ্রিন্টিং ত্বকের বাহ্যিক ক্ষত নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়। শরীরের অভ্যন্তরে কোনো ক্ষতস্থানে পৌঁছানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।”
অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে স্বরযন্ত্রের সিস্ট বা টিউমার অপসারণের পর অনেকেরই কথা বলায় সমস্যা দেখা দেয়, কারণ স্বরযন্ত্রে দাগ পড়ে এবং তা শক্ত হয়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, হাইড্রোজেল ইনজেকশন (যা স্বরযন্ত্রের প্রাকৃতিক গঠন অনুকরণ করে নতুন টিস্যু গজাতে সহায়তা করে) নিরাময়ের প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করে। কিন্তু গলার ভেতরে দৃষ্টিসীমা সীমিত হওয়ায় অস্ত্রোপচারের সময় এসব বায়োম্যাটেরিয়াল নির্ভুলভাবে প্রয়োগ করা কঠিন হয়।
এই সমস্যার সমাধানে কানাডার মন্ট্রিয়লের ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার সুইন গ্রোয়েন ভাবেন, প্রকৃতি থেকেই হয়তো সমাধান পাওয়া যেতে পারে। যদি হাতির শুঁড়ের মতো নড়াচড়া করতে পারে এমন নরম রোবোটিক বাহু তৈরি করা যায়, তবে সেটি কি ক্ষুদ্রাকারে সার্জারির কাজে ব্যবহার করা সম্ভব?
ক্রেডিট: Swen Groen
গ্রোয়েন ও তাঁর সহকর্মীরা প্রথমে ৮ মিলিমিটার ব্যাসের একটি প্রোটোটাইপ তৈরি করেন। পরে এটি আরও ক্ষুদ্র আকৃতির করে এমনভাবে ডিজাইন করা হয় যাতে ১ সেন্টিমিটার প্রশস্ত সার্জিক্যাল স্কোপের মধ্য দিয়েও সহজে প্রবেশ করানো যায়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এটি হায়ালুরোনিক অ্যাসিড-ভিত্তিক হাইড্রোজেলের ক্ষুদ্র ফোঁটা নির্ভুলভাবে প্রয়োগ করে কৃত্রিম স্বরযন্ত্রের ফাঁকা স্থান পূরণ করতে সক্ষম। গ্রোয়েন বলেন, “এই ক্ষুদ্রাকরণ প্রক্রিয়াই সবচেয়ে বেশি সময় নিয়েছে।”
বর্তমানে প্রশিক্ষিত অপারেটররা প্লে-স্টেশন কন্ট্রোলার ব্যবহার করে হাতে-কলমে এই ছোট প্রিন্টারটি নিয়ন্ত্রণ করেন। তবে দলটি এখন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে তারা বায়োপ্রিন্টারটিকে এমনভাবে প্রোগ্রাম করতে চায় যে, সার্জারির স্থানের ছবি দেখিয়ে দিলে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দিষ্ট পথে প্রিন্ট করতে পারে।
ওজবোলাট জানতে আগ্রহী, প্রাণীতে পরীক্ষার আগে (যা মানব ট্রায়ালের পূর্বশর্ত) দলটিকে কি যন্ত্রের নকশায় পরিবর্তন আনতে হবে কিনা। উদাহরণস্বরূপ, বানর বা ইঁদুরের জন্য যন্ত্রটির আকার আলাদা করতে হতে পারে।
আরও উন্নয়ন ও পরীক্ষার পর এই ক্ষুদ্র বায়োপ্রিন্টারের ব্যবহার কেবল স্বরযন্ত্র মেরামতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে মনে করেন গবেষকেরা। চিকিৎসকেরা ভবিষ্যতে হয়তো এই হাতি-অনুপ্রাণিত বাহু ব্যবহার করে সার্জারির সরঞ্জাম (যেমন স্ক্যালপেল বা ফোর্সেপস) আরও নির্ভুলভাবে পরিচালনা করতে পারবেন, যা বর্তমানে জটিল স্থানে ব্যবহারে ততটা সহজ নয়। সহলেখক ও ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার লুস মঞ্জো বলেন, “এই বহুমুখী ব্যবহারই সত্যি দারুণ হতে পারে।”
———
A continuum robotic bioprinter for in situ vocal fold repair. Device (2025).
DOI: 10.1016/j.device.2025.100973
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



