মাটিতে থাকা এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া কীভাবে ওষুধ তৈরি করে, সেই প্রক্রিয়াটি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা এমন এক শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করেছেন, যা ওষুধ-প্রতিরোধী সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সম্প্রতি Journal of the American Chemical Society-তে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ব্যাকটেরিয়া Streptomyces coelicolor কীভাবে বহু-ধাপের মাধ্যমে ১৯৬৫ সালে শনাক্ত হওয়া অ্যান্টিবায়োটিক মেথাইলিনোমাইসিন এ (methylenomycin A) তৈরি করে, তা অনুসন্ধান করেন। এ সময় তারা একটি মধ্যবর্তী যৌগ প্রিমেথাইলিনোমাইসিন সি ল্যাকটোন (premethylenomycin C lactone ) আবিষ্কার করেন, যার অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ক্ষমতা মেথাইলিনোমাইসিন এ-এর তুলনায় ১০০ গুণ বেশি। অতি ক্ষুদ্র মাত্রাতেই এটি বিভিন্ন কঠিন সংক্রমণ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া হত্যা করতে সক্ষম হয়।
গবেষণার সহ-লেখক, যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারউইকের কেমিক্যাল বায়োলজিস্ট গ্রেগরি চ্যালিস বলেন, এই আবিষ্কারটি ছিল “সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত।” তাঁর ভাষায়, “আমরা সাধারণত মনে করি বিবর্তন চূড়ান্ত অণুকেই সবচেয়ে নিখুঁত করে, তাই শেষ পণ্যটিই সর্বোত্তম হবে, এটাই স্বাভাবিক ধারণা। কিন্তু এই ফলাফল দেখায় যে বিবর্তন আসলে এক ‘ব্লাইন্ড ওয়াচমেকার’। এই অণুগুলো তার নিখুঁত উদাহরণ।”
বিশ্বব্যাপী অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা ওষুধ-প্রতিরোধী সংক্রমণ আগামী ২৫ বছরে ৩৯ মিলিয়ন মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তাই এ ধরনের শক্তিশালী নতুন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল যৌগ নতুন ওষুধের সম্ভাবনা উন্মোচন করতে পারে, বলছেন গবেষকেরা। কানাডার ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটির বায়োকেমিস্ট জেরার্ড রাইট মন্তব্য করেন, পুরোনো জৈব-রাসায়নিক পথগুলো থেকে নতুন সক্রিয় যৌগ শনাক্ত করার সম্ভাবনা এই গবেষণা জোরালোভাবে তুলে ধরে।
২০০৬ সালে চ্যালিস ও তাঁর সহকর্মীরা ব্যাকটেরিয়া Streptomyces coelicolor কীভাবে মেথাইলিনোমাইসিন এ তৈরি করে, সেই আনুবীক্ষণিক রাসায়নিক ধাপগুলো বিশ্লেষণ শুরু করেন। প্রতিটি ধাপের এনজাইম তৈরির জন্য দায়ী জিন তারা একে একে মুছে দেখতেন। এই গবেষণা ২০০২ সালে ব্যাকটেরিয়াটির জিনোম সিকোয়েন্সিং-এর ওপর ভিত্তি করে এগোতে থাকে।
২০১০ সালের মধ্যে তারা মেথাইলিনোমাইসিন এ তৈরির পুরো রোডম্যাপ ম্যাপ করেন এবং মধ্যবর্তী বেশ কিছু অণু চিহ্নিত করেন।
“এগুলো ছিল মূলত মৌলিক গবেষণা,” বলেন চ্যালিস। “তখন আমরা জানতাম না এই মধ্যবর্তী অণুগুলো নিয়ে কী করা যায়।”
পরে, ২০১৭ সালের দিকে, চ্যালিসের ল্যাবের এক পিএইচডি শিক্ষার্থী এই মধ্যবর্তী অণুগুলোর অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল কার্যকারিতা পরীক্ষা করেন।
পরীক্ষায় দেখা যায়, দুটি অণু, বিশেষ করে প্রিমেথাইলিনোমাইসিন সি ল্যাকটোন, সাত ধরনের গ্রাম-পজিটিভ ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে মেথাইলিনোমাইসিন এ-এর তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। এর মধ্যে ছিল Staphylococcus aureus, যা ত্বক, রক্ত ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গ সংক্রমণ করে এবং Enterococcus faecium, যা মারণ রক্তসংক্রমণ ও মূত্রনালির সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
ওষুধ-প্রতিরোধী Staphylococcus aureus ধ্বংস করতে প্রয়োজন হয় মাত্র ১ মাইক্রোগ্রাম/মিলিলিটার, যেখানে মেথাইলিনোমাইসিন এ-এর দরকার হয় ২৫৬ মাইক্রোগ্রাম/মিলিলিটার। এমনকি ভ্যানকোমাইসিন (শেষ পর্যায়ের অ্যান্টিবায়োটিক) এর চেয়েও কম মাত্রায় এটি ব্যাকটেরিয়া হত্যা করতে পারে।
এরপর গবেষকেরা পরীক্ষা করেন নতুন অ্যান্টিবায়োটিকটির বিরুদ্ধে E. faecium কত দ্রুত প্রতিরোধ তৈরি করতে পারে। টানা ২৮ দিন ধরে বাড়তি ঘনত্বে অণুটি প্রয়োগের পরও এর কার্যকারিতা অপরিবর্তিত থাকে অর্থাৎ ব্যাকটেরিয়া সহজে প্রতিরোধ তৈরি করতে পারেনি। অন্যদিকে ভ্যানকোমাইসিনে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত মিউটেশন ঘটিয়ে প্রতিরোধী হয়ে ওঠে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল রেজিস্ট্যান্স-বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টোফার স্কোফিল্ড বলেন, “একটি রাসায়নিকভাবে আকর্ষণীয় অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে মৌলিক গবেষণা থেকে কী চমৎকার ও অপ্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়, তার দারুণ উদাহরণ এটি।”
এ বছরের শুরুতে চ্যালিসের দলের সঙ্গে আরেকটি গবেষণা দল মিলে সহজলভ্য কাঁচামাল ব্যবহার করে অণুটির কম খরচে সংশ্লেষণ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে, যা ভবিষ্যতে বড় মাত্রায় উৎপাদন সম্ভব করতে পারে।
তবে গবেষকেরা প্রথমে জানতে চান, অণুটি ব্যাকটেরিয়ার কোন অংশকে আক্রমণ করে। সহ-লেখক লোনা আলখালাফ বলেন, “আমরা ধারণা করছি এটি কোষ প্রাচীরকে কোনোভাবে লক্ষ্য করে, তবে সঠিক মেকানিজম এখনও অজানা।”
এ ছাড়া স্তন্যপায়ী প্রাণীর কোষে এর বিষক্রিয়া বা টক্সিসিটিও যাচাই করা জরুরি। চ্যালিসের মতে, কার্যকারিতা বজায় রেখে মানবদেহে ক্ষতিকর দিকগুলো বাদ দেওয়ার মতো পরিবর্তিত অণুও ভবিষ্যতে তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
———
Discovery of late intermediates in methylenomycin biosynthesis active against drug-resistant Gram-positive bacterial pathogens. Journal of the American Chemical Society (2025).
DOI: 10.1021/jacs.5c12501
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


