আর্টেমিস ২ (ARTEMIS II) এর স্পেস ক্রাফ্ট, ওরিয়ন এখন পৃথিবী থেকে রেকর্ড সৃষ্টিকারী ৪,০৬,৭৭১ কিমি পথ পাড়ি দিয়ে এবং চাঁদকে প্রদক্ষিণ করার পর এখন বাড়ির পথে। ইতিমধ্যেই তারা চাঁদের গ্রাভিটেশনাল স্পিয়ার অফ ইনফ্লুয়েন্সে পার হয়ে এসেছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হল যে, চাঁদের গ্রাভিটেশনাল স্পিয়ার অফ ইনফ্লুয়েন্সে ঢুকতে তাদের কোনো মুক্তি বেগ দরকার পড়েনি।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে মুক্তি বেগ কী? ধরা যাক পৃথিবী থেকে একটি বস্তুকে মহাশূন্যে পাঠাতে হবে, সেজন্য তো তাকে প্রথমে পৃথিবীর অভিকর্ষ টান কাটিয়ে উঠতে হবে। সেজন্য তাকে পর্যাপ্ত বেগ দেওয়া দরকার। পৃথিবীর ক্ষেত্রে সেই বেগের মান ১১.২ কিমি/সেকেন্ড; অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুর ক্ষেত্রে তা আলাদা । এক্ষেত্র যদি আমরা সূর্য ও চাঁদের মহাকর্ষ গণনার মধ্যে আনি, তাহলে সেই মানটা গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪২ কিমি/সেকেন্ড। কিন্তু এই বেগ বজায় রাখার মতো শক্তিশালী কোনো রকেট, নাসা বা অন্য কোনো স্পেস এজেন্সি এখনো পর্যন্ত বানাতে পারেনি। স্বভাবতই প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে কীভাবে মঙ্গল, বৃহস্পতি বা সৌরজগতের বাইরে মহাকাশযান পাঠানো হচ্ছে?
সেটা বুঝতে গেলে আমাদেরকে একবার পৃথিবীর ঘূর্ণনকে বুঝতে হবে। পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে ২৯.৮ কিমি/সেকেন্ড গতিতে; এখন সেই অভিমুখে কোনো রকেটকে যদি ১০ কিমি/সেকেন্ড গতিবেগ দেওয়া যায়, তাহলে মোট লব্ধি বেগ হবে ৪০ কিমি/সেকেন্ডের কাছাকাছি। কিন্তু এই বেগ নিয়ে রকেটটি সৌরজগতের বাইরের দিকে যত আগাবে, ততই সূর্য বা অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুর মহাকর্ষের টানের কবলে পড়বে। ফলস্বরূপ, রকেটটির বেগ ক্রমশই কমতে থাকবে। সেজন্য বিজ্ঞানীরা কাজে লাগান স্লিংশট এফেক্ট। মানে ধরুন মঙ্গলের উদ্দেশ্যে রকেটটিকে পাঠানোর সময়, সেটি যখন লাল গ্রহের গ্রাভিটেশনাল স্পিয়ার অফ ইনফ্লুয়েন্সে ঢুকে পড়ে, তখন সেটাকে কাজে লাগিয়ে যানটির গতিবেগ বাড়ানো সম্ভব হয়।
ক্রেডিট: Jasiek Krzysztofiak/Nature/BigganBart
আর্টেমিস ২ এর মিশনের ক্ষেত্রে, প্রথম ২৪ ঘণ্টা পর, রকেটটিকে একটা গতি দেওয়া হয়, যার নাম ‘ট্রান্স-লুনার ইনজেকশন’। এই সময় ওরিয়নের গতিবেগ ৮ কিমি/সেকেন্ড থেকে বেড়ে হয় ১০.৩ কিমি/সেকেন্ড। চাঁদে যাওয়ার মূল ধাক্কা শুরু হয় তখনই। এরপর রকেটের বিশেষ কোনো ভূমিকা নেই; বাকিটা সামলে দেয় গতিজাড্য।
একটা সহজ উদাহরণ দিলে বোঝার সুবিধা হবে। ধরুন একটি ঢিলকে আপনি কিছু গতিবেগ দিয়ে উপরের দিকে ছুঁড়ে দিলেন, ঢিলটা ওপরে উঠবে ঠিকই, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তার গতিবেগ কমতে থাকবে। চন্দ্রযানের ক্ষেত্রে সেরকম হলো; চাঁদের দিকে যত সে এগোচ্ছে, ততই তার গতিবেগ কমছে, চাঁদের কাছাকাছি পৌঁছানোর সময় তার বেগ কমে দাঁড়াবে ১ কিমি/সেকেন্ড। অর্থাৎ, ওরিয়নের গড় বেগ ১০.৩ কিমি/সেকেন্ড থেকে কমে হবে ১ কিমি/সেকেন্ড। চাঁদের মহাকর্ষের টানে ওরিয়ন চাঁদের পিছনের দিকে চলে আসে, এবং চাঁদ ও পৃথিবীর মহাকর্ষ বলের সম্মিলিত প্রভাবে সে আবার পৃথিবী অভিমুখে যাত্রা শুরু করবে। এটিকেই বিজ্ঞানীরা বলছেন ফ্রি-রিটার্ন ট্র্যাজেক্টরি (Free-return trajectory)। এই সময়, যদিও ছোটো থাস্টারের সাহায্যে কিছুটা বেগ তাকে দেওয়া হয়। কিন্তু পুরো মিশনটা এমনভাবেই পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেন জ্বালানি খরচ মিনিমাম হয়। পুরো ব্যাপারটা এমন যেন একটি ঢিলকে পৃথিবী থেকে চাঁদের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে, সেটি চাঁদের কাছে পৌঁছে আবার পৃথিবীর দিকে ফিরে আসছে। আর এটি সম্ভব হয়েছে একমাত্র মহাকর্ষ বলের জন্য।
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



