১৯৮১ সালে এক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত প্রবন্ধে বিবর্তনবিদ স্টিফেন জে গোল্ড একটি অদ্ভুত সত্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অনেক জলজ প্রাণী (যেমন লাংফিশ ও সিলাক্যান্ত) চার অঙ্গবিশিষ্ট স্থলচর মেরুদণ্ডীদের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ, সাধারণ মাছের তুলনায়। তাই তিনি মজার ছলে বলেছিলেন, “মাছ বলে আলাদা কিছু নেই।”
এখন দেখা যাচ্ছে, হাঙরের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। নতুন এক জিনগত গবেষণা বলছে, আমরা যাদের সবাইকে হাঙর বলি, তারা হয়তো একটি স্বাভাবিক জীববৈজ্ঞানিক গোষ্ঠী নয়।
এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে bioRxiv-এ। এতে গবেষকেরা বিভিন্ন হাঙর ও তাদের আত্মীয় প্রজাতির জিনোম বিশ্লেষণ করেছেন। বিশেষ করে তারা এমন কিছু “অতি-সংরক্ষিত” জিনগত অংশ পরীক্ষা করেছেন, যেগুলো বিবর্তনের দীর্ঘ সময়ে প্রায় অপরিবর্তিত থাকে।
ফলাফলে দেখা যায়, Hexanchiformes নামে এক অদ্ভুত হাঙরগোষ্ঠী অন্য সব হাঙর, স্কেট ও রে মাছের থেকে আলাদা এক বিবর্তনীয় শাখায় থাকতে পারে। এই গোষ্ঠীর হাঙরদের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন, যেমন তাদের সাধারণ পাঁচটির বদলে ছয় বা সাতটি গিল-ছিদ্র থাকে, চোয়াল তুলনামূলক প্রাচীন প্রকৃতির, আর দেহ কিছুটা ইলের মতো লম্বাটে।
এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, যেসব প্রাণীকে আমরা হাঙর বলি, তাদের অনেকেই আসলে রে ও স্কেটের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ, Hexanchiformes-এর তুলনায়। জীববিজ্ঞানে এমন গোষ্ঠীকে বলা হয় “প্যারাফাইলেটিক”, যেখানে সব সদস্যের একটি অভিন্ন পূর্বপুরুষ থাকলেও তার সব বংশধর এতে অন্তর্ভুক্ত থাকে না।
যদিও এই প্রশ্নটি অনেক গবেষকের কাছে খুব জরুরি মনে না-ও হতে পারে, তবে সঠিক বিবর্তনীয় বৃক্ষ বা ফাইলোজেনি তৈরি করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাভিন নেইলর বলেন, জীবনের বিবর্তন বোঝার জন্য নির্ভুল ফ্যামিলি ট্রি দরকার।
পরিবর্তিত হচ্ছে সংজ্ঞা
হাঙর, রে ও স্কেটসহ যেসব প্রাণীর কঙ্কাল তরুণাস্থি দিয়ে তৈরি, তারা সবাই Chondrichthyes নামে একটি বড় গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। প্রায় ৪০০ মিলিয়ন বছর আগে এদের পূর্বপুরুষ হাড়যুক্ত মাছের সঙ্গে এক ছিল।
গ্যাভিন নেইলর জানান, আধুনিক হাঙরের মতো দেখতে প্রাণী অন্তত ৩৩০ মিলিয়ন বছর ধরে পৃথিবীতে রয়েছে।
কিন্তু এই গোষ্ঠীর ভেতরের সদস্যরা কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা আছে। শারীরবৃত্তীয় গবেষণায় কখনো রে ও স্কেটকে হাঙর থেকে আলাদা ধরা হয়েছে, আবার কখনো হাঙরেরই একটি উপগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
সীমিত জিনগত তথ্যের ওপর ভিত্তি করা গবেষণাগুলোও সাধারণত হাঙর ও রে-স্কেটকে আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে দেখিয়েছে। তবে এখন বিজ্ঞানীরা পুরো জিনোম ব্যবহার করে নতুনভাবে জীবন বৃক্ষ আঁকছেন, আর তাতেই আসছে নতুন ও কখনো বিতর্কিত ফলাফল।
এই গবেষণায় টমাস নিয়ার এবং চেজ ব্রাউনস্টাইন ৪৮টি প্রজাতির জিনোম বিশ্লেষণ করেন। তারা দুই ধরনের তথ্য দেখেন
এক, ৮৪০টি প্রোটিন তৈরির জিন
দুই, প্রায় ৩৫০টি অতি-সংরক্ষিত জিনগত অঞ্চল।
প্রোটিন-সম্পর্কিত জিনগুলো আগের মতোই দেখায়, যেখানে সব হাঙর এক গোষ্ঠী। কিন্তু অতি-সংরক্ষিত অঞ্চলগুলো ভিন্ন চিত্র দেয়। সেখানে Hexanchiformes আলাদা শাখা তৈরি করে, আর বাকি হাঙর, রে ও স্কেট একসঙ্গে থাকে।
এর মানে হতে পারে, চ্যাপ্টা দেহের রে মাছ আসলে হাঙরের মতো পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত হয়েছে। চেজ ব্রাউনস্টাইন বলেন, এতে বোঝা যায় হাঙরের শরীরের গঠন আগে এসেছে, পরে রে ও স্কেট তৈরি হয়েছে।
চোয়ালের বিবর্তনের ইতিহাস
গ্যাভিন নেইলর এবং তার দলও হাঙরের ফ্যামিলি ট্রি-তে অস্থিরতা খুঁজে পেয়েছেন। ২০২৫ সালের এক গবেষণায় তারা দেখান, হাঙর ও রে-স্কেট একসঙ্গে একটি গোষ্ঠী তৈরি করে, যেখানে Hexanchiformes বাদ পড়ে। তবে ভিন্ন ডেটা বিশ্লেষণে আবার আলাদা ফলও পাওয়া গেছে।
নেইলর মনে করেন, কোটি কোটি বছরের বিবর্তনে অনেক জিনগত সংকেত হারিয়ে গেছে। তাই শুধু জিনগত তথ্য সবসময় পরিষ্কার ছবি দেয় না। তার মতে, শারীরবৃত্তীয় গঠন এখনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়।
এই বিতর্কের বাস্তব গুরুত্বও আছে। যদি Hexanchiformes সত্যিই আলাদা হয়, তাহলে তাদের অদ্ভুত চোয়াল প্রাচীন চোয়ালের একটি প্রাথমিক রূপ হতে পারে। এটি চোয়ালের বিকাশ ও রোগ নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে গবেষণায় কাজে লাগতে পারে।
এছাড়া, সঠিক বিবর্তনীয় ট্রি সংরক্ষণবিদদের সাহায্য করবে হাঙরের বৈচিত্র্য বুঝতে। বর্তমানে অতিরিক্ত মাছ ধরা, জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে হাঙর হুমকির মুখে।
চেজ ব্রাউনস্টাইন বলেন, হাঙরদের মধ্যে অন্য যেকোনো মেরুদণ্ডী প্রাণীর তুলনায় বেশি বিবর্তনীয় ইতিহাস জমা আছে। তাই আমরা কী হারাতে যাচ্ছি, তা বুঝতে হলে একটি নির্ভুল বৃক্ষ দরকার।
———
Phylogenomics and the origins of sharks, bioRxiv (2026)
DOI: 10.64898/2026.02.13.705779
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


