হাজার হাজার বছর ধরে গুহার দেয়াল ও শিলাচিত্রে প্রাচীন মানুষের ডিএনএ সংরক্ষিত থাকতে পারে। স্পেন ও পর্তুগালের বিভিন্ন গুহায় পরিচালিত নতুন এক গবেষণায় এমন প্রমাণ মিলেছে। এই আবিষ্কার প্রাগৈতিহাসিক মানুষের জীবন সম্পর্কে জানার নতুন পথ খুলে দিয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেও সাহায্য করতে পারে। নেয়ান্ডারথালরাও কি গুহার দেয়ালে ছবি আঁকত?
দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব দ্য উইটওয়াটারস্র্যান্ডের গবেষক জেনিভিভ ভন পেটজিঙ্গার বলেন, “এটি এক নতুন যুগের সূচনা। এখন আমাদের সামনে এমন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যেখানে আমরা এই শিল্পকর্মের প্রকৃত শিল্পীদের সঙ্গেই পরিচিত হতে পারি। অর্থাৎ যে ব্যক্তি হাজার হাজার বছর আগে এই ছবি এঁকেছিলেন, তার পরিচয়ের কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে। বিষয়টি সত্যিই অসাধারণ।”
২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে “ফার্স্ট আর্ট” প্রকল্পের গবেষকরা স্পেন ও পর্তুগালের ১১টি গুহা থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন গুহাচিত্রের বয়স নির্ধারণ করা।
গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত গুহাগুলোতে মূলত লাল গেরুয়া রঙ দিয়ে আঁকা ত্রিভুজ, বিন্দু, হাতের ছাপ এবং অন্যান্য সাধারণ নকশা ছিল। গবেষকদের ধারণা, এগুলোই মানুষের তৈরি সবচেয়ে প্রাচীন গুহাচিত্রের মধ্যে অন্যতম।
নমুনা সংগ্রহের সময় গবেষকরা কোথাও রঙের ক্ষুদ্র অংশ সাবধানে তুলে নেন, আবার কোথাও গুহার দেয়ালে পানির খনিজ জমে তৈরি হওয়া পাতলা ক্যালসাইট স্তর সরিয়ে পরীক্ষা করেন।
প্রাগৈতিহাসিক যুগে মানুষ অনেক সময় মুখ থেকে রঙ ছিটিয়ে বা হাত ও আঙুল দিয়ে গুহার দেয়ালে ছবি আঁকত। তাই গবেষকদের ধারণা ছিল, ছবি আঁকার সময় শিল্পীদের শরীর থেকে বের হওয়া কিছু ডিএনএ হয়তো দেয়ালে থেকে গেছে।
গত এক দশক ধরে বিজ্ঞানীরা জানতেন, গুহার মেঝেতে জমে থাকা মাটির স্তরে প্রাচীন মানুষের ডিএনএ সংরক্ষিত থাকতে পারে। কিন্তু গুহার দেয়ালে এমন ডিএনএ আগে কখনো পাওয়া যায়নি।
এবার সেই ধারণাই বদলে গেল। পর্তুগালের এসকোরাল গুহায় সেমিকোলনের মতো দেখতে লাল রঙের একটি চিহ্নে প্রাচীন মানুষের ডিএনএ শনাক্ত করেছেন গবেষকরা। জার্মানির লাইপজিগে অবস্থিত ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ইভোল্যুশনারি অ্যানথ্রোপোলজির গবেষক আলবা বসোমস মেসা বলেন, “এটি আমাদের জন্য আনন্দদায়ক বিস্ময় ছিল।” এটাই প্রথম ঘটনা, যেখানে গুহার দেয়ালে প্রাচীন মানুষের ডিএনএ পাওয়া গেল। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে এই ডিএনএ সেই ব্যক্তির, যিনি ছবিটি এঁকেছিলেন। পরে কেউ ছবিটি স্পর্শ করে থাকতে পারেন, কিংবা গুহায় এসে হাঁচি দেওয়ার মাধ্যমেও ডিএনএ সেখানে পৌঁছাতে পারে।
তারপরও এই আবিষ্কার একদিন গুহাচিত্রের প্রকৃত শিল্পীদের শনাক্ত করার পথ খুলে দিয়েছে। স্পেনের এক্সত্রেমাদুরা আঞ্চলিক সরকারের প্রত্নতত্ত্ববিদ হিপোলিতো কোলিয়াদো গিরালদো বলেন, “মনে হচ্ছে গুহার দেয়ালগুলো যেন একটি ফাঁকা বইয়ের পাতায় পরিণত হয়েছে। নতুন নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে আমরা ধীরে ধীরে সেই বইয়ের পৃষ্ঠাগুলো পূরণ করতে পারব।”
গবেষণার আরেকটি বড় চমক আসে নিয়ন্ত্রণ নমুনা সংগ্রহের সময়। গবেষকরা গুহার এমন কিছু অংশ থেকেও নমুনা নেন, যেখানে কোনো চিত্রই ছিল না। উদ্দেশ্য ছিল তুলনা বিশ্লেষণ করা। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সেখানেও প্রাচীন মানুষের ডিএনএ পাওয়া যায়।
গবেষকদের ধারণা, হাজার হাজার বছর আগে গুহায় প্রবেশ করা মানুষ দেয়াল স্পর্শ করেছিল। সেই স্পর্শের ডিএনএ আজও সেখানে রয়ে গেছে। কোলিয়াদো গিরালদো বলেন, “আমরা সত্যিই বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলাম।” এর অর্থ হলো, যেখানে কোনো গুহাচিত্র বা প্রত্নবস্তু নেই, সেই গুহার দেয়ালও প্রাচীন মানুষের উপস্থিতির মূল্যবান তথ্য সংরক্ষণ করে থাকতে পারে।
ক্রেডিট: Matthias Meyer
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এসকোরাল গুহার দেয়ালে পাওয়া ডিএনএ সম্ভবত মানুষের সরাসরি স্পর্শ থেকেই এসেছে। গুহার মেঝের মাটি থেকে এসে দেয়ালে জমা হয়নি। কারণ, মাটিতে পাওয়া মানুষের ডিএনএর সঙ্গে সাধারণত বিভিন্ন প্রাণীর ডিএনএও মিশে থাকে। কিন্তু এসকোরাল গুহার দেয়ালের নমুনায় শুধুই মানুষের ডিএনএ পাওয়া গেছে।
এই ডিএনএ বিশ্লেষণ করে গবেষকরা প্রাচীন মানুষদের সম্পর্কেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পেরেছেন। চারটি নমুনার মধ্যে তিনটিতে নারীদের ডিএনএ বেশি ছিল। আর একটি নমুনায় পুরুষের ডিএনএ প্রধান ছিল। জিনগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই মানুষেরা পশ্চিমাঞ্চলীয় শিকারি সংগ্রাহক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিল রাখে। এই জনগোষ্ঠী প্রায় ১৭ হাজার থেকে ৫ হাজার ২০০ বছর আগে ইউরোপে বসবাস করত।
সংগৃহীত ডিএনএর পরিমাণ এত কম ছিল যে নির্দিষ্টভাবে এর বয়স নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে গবেষকরা জানেন, এসকোরাল গুহার প্রবেশপথ প্রায় ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার বছর আগে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাই ধারণা করা হচ্ছে, দেয়ালে পাওয়া ডিএনএ তারও আগের সময়ের।
তবে গবেষকদের মতে, এই গবেষণা কেবল শুরু। এই মাসের শুরুতেই ভন পেটজিঙ্গার, কোলিয়াদো গিরালদোসহ ফার্স্ট আর্ট প্রকল্পের গবেষকেরা স্পেনের আরও কয়েকটি গুহা থেকে ব্যাপকভাবে নমুনা সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে নেরহা ও আরদালেস গুহাও রয়েছে। অনেক গবেষকের মতে, এসব গুহার কিছু চিত্র নেয়ান্ডারথালদের আঁকা। যদিও এ নিয়ে এখনো বিজ্ঞানীদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক চলছে।
আলবা বসোমস মেসা বলেন, “আমি সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটির উত্তর জানতে চাই, তা হলো নেয়ান্ডারথালরা সত্যিই শিল্পকর্ম তৈরি করত কি না।”
ফ্রান্সের বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ফ্রান্সেসকো দ’এরিকো, যিনি এই গবেষণায় অংশ নেননি, বলেন গুহার দেয়াল থেকে ডিএনএ সংগ্রহের এই পদ্ধতি প্রাচীন মানুষ এবং তাদের আঁকা ছবিগুলো সম্পর্কে জানার নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
তার মতে, এখন এমন প্রশ্নের উত্তর খোঁজা সম্ভব হতে পারে, যেমন শিল্পীরা পুরুষ ছিলেন, নারী ছিলেন, নাকি উভয়ই ছিলেন? একই দেয়ালে থাকা বিভিন্ন প্রাণীর ছবি কি একজন শিল্পী এঁকেছিলেন, নাকি একাধিক ব্যক্তি? আইবেরীয় উপদ্বীপের সবচেয়ে প্রাচীন চিত্রে কি নেয়ান্ডারথালের ডিএনএ পাওয়া যাবে? অথবা ইন্দোনেশিয়ার হাতের ছাপের গুহাচিত্রে কি ডেনিসোভান মানুষের ডিএনএ লুকিয়ে আছে? তিনি বলেন, এই গবেষণার সম্ভাবনা সত্যিই বিশাল।
তবে একটি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। গবেষকরা মোট ২৪টি গুহাচিত্র থেকে নমুনা সংগ্রহ করলেও মাত্র একটি চিত্রে প্রাচীন মানুষের ডিএনএ শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ এ ধরনের ডিএনএ সংরক্ষিত থাকা বিরল ঘটনাই হতে পারে।
আলবা বসোমস মেসা বলেন, “এখন পর্যন্ত সাফল্যের হার খুবই কম।” তার মতে, ভবিষ্যতে গবেষকরা আরও উন্নত পদ্ধতিতে অতি অল্প পরিমাণ ডিএনএ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে পারলে এই সাফল্যের হার বাড়বে।
কোলিয়াদো গিরালদো এই আবিষ্কারের আরেকটি দিক নিয়ে বেশি আশাবাদী। তিনি বলেন, প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ সব সময় কিছু মূল্যবান তথ্য স্থায়ীভাবে নষ্ট করে ফেলে। কারণ খননের মাধ্যমে প্রত্নস্থলের একটি অংশ চিরতরে সরিয়ে ফেলতে হয়।
কিন্তু গুহার দেয়াল থেকে ডিএনএ সংগ্রহের এই নতুন পদ্ধতি খনন ছাড়াই অতীতের অজানা ইতিহাস তুলে ধরার সুযোগ এনে দিয়েছে।
তার ভাষায়, “এই প্রযুক্তি আমাদের সম্পূর্ণ নতুন গল্প খুঁজে বের করার সুযোগ দিচ্ছে। এমন গল্প, যা অতীতের মানুষ ও তাদের সমাজ সম্পর্কে আরও গভীর ধারণা দিতে সাহায্য করবে।”
———
Investigating ancient human DNA preservation on cave walls and in rock art. Nat Commun (2026).
DOI: 10.1038/s41467-026-74234-2
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



