বিলুপ্ত প্রাণী পুনর্জীবিত করার ক্ষেত্রে পরিচিত প্রতিষ্ঠান কলোসাল বায়োসায়েন্সেসকে হয়তো অন্য গবেষকরা ছাড়িয়ে যেতে চলেছেন। বিজ্ঞানীরা এক বছরেরও বেশি সময় ধরে গভীর হিমায়িত বা ডিপ ফ্রোজেন অবস্থায় সংরক্ষিত একটি ধেড়ে ইঁদুরের ক্রোমোজোম জীবিত নেংটি ইঁদুরের কোষে স্থানান্তর করতে সক্ষম হয়েছেন। এরপর তারা এমন নেংটি ইঁদুরও তৈরি করেছেন, যাদের শরীরের কিছু কোষে অতিরিক্ত ওই ধেড়ে ইঁদুরের ক্রোমোজোম উপস্থিত রয়েছে।
জাপানের তেরুহিকো ওয়াকায়ামা বলেন, “প্রযুক্তিটি আরও উন্নত করতে পারলে আমরা হাতির কোষে এটি পরীক্ষা শুরু করব। যদি নেংটি ইঁদুরের ভ্রূণীয় স্টেম সেলে হাতির ক্রোমোজোম সফলভাবে প্রবেশ করাতে পারি, তাহলে অবশ্যই ম্যামথের ক্ষেত্রেও চেষ্টা করব।”
গবেষকদের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হলো জীবিত প্রাণীর শরীরে বিলুপ্ত প্রাণীর জিন কীভাবে কাজ করে তা পর্যবেক্ষণ করা। শুধুমাত্র জিনের সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করে যত তথ্য পাওয়া যায়, তার চেয়ে অনেক বেশি তথ্য এভাবে জানা সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি এই প্রযুক্তি সংরক্ষণ জীববিজ্ঞান এবং বিলুপ্ত প্রাণী পুনরুজ্জীবন প্রচেষ্টায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন হাওয়াইয়ের একটি পাখি ‘পোওউলি’ (poʻouli)-এর কথা, যা ২০০৪ সালে বিলুপ্ত হয়ে যায়। এ পাখিটির সংরক্ষিত টিস্যু এখনও রয়েছে। জীববিজ্ঞানের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে একে পুনর্জীবিত করতে হলে ক্রোমোজোম স্থানান্তর প্রযুক্তি অপরিহার্য হবে।
প্রাণীদের জিনোম বিভিন্ন অংশে বিভক্ত থাকে, যেগুলোকে ক্রোমোজোম বলা হয়। কোষ বিভাজনের সময় দীর্ঘ ডিএনএ অণুগুলো অত্যন্ত ঘনভাবে প্যাক হয়ে পাঠ্যবইয়ে দেখা পরিচিত দণ্ডাকার বা সিলিন্ডার আকৃতি ধারণ করে। এসব সংকুচিত ক্রোমোজোমকে জীবিত কোষের ভেতরেও ক্ষতি না করেই দেখা যায়। এজন্য ডিএনএকে ঘিরে থাকা প্রোটিনের সঙ্গে যুক্ত অ্যান্টিবডিতে বিশেষ রঞ্জক ব্যবহার করা হয়।
ওয়াকায়ামার প্রযুক্তিতে প্রথমে একটি কোষের নিউক্লিয়াস বের করে ডিম্বাণুর মধ্যে প্রবেশ করানো হয়। এর ফলে ক্রোমোজোমগুলো সংকুচিত অবস্থায় আসে। পদ্ধতিটি ক্লোনিংয়ে ব্যবহৃত নিউক্লিয়ার ট্রান্সফার প্রযুক্তির সঙ্গে অনেকটাই মিল রয়েছে। উল্লেখ্য, ভেড়া ডলির জন্মের পরপরই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রথম সফলভাবে নেংটি ইঁদুর ক্লোন করেছিলেন ওয়াকায়ামা।
এরপর নিউক্লিয়াসযুক্ত ডিম্বাণুতে এমন কিছু এনজাইম প্রবেশ করানো হয়, যা ক্রোমোজোমগুলোকে আলাদা করতে সাহায্য করে। তারপর অত্যন্ত সূক্ষ্ম ফাঁপা সূঁচের সাহায্যে একটি একক ক্রোমোজোম বের করে আরেকটি ডিম্বাণুতে প্রবেশ করানো হয়। যদি এই ডিম্বাণু থেকে ভ্রূণ তৈরি হয়, তাহলে ভ্রূণের সব ভ্রূণীয় স্টেম সেলে ওই অতিরিক্ত ক্রোমোজোম উপস্থিত থাকে।
ক্রেডিট: University of Yamanashi
প্রথমে অতিরিক্ত নেংটি ইঁদুরের ক্রোমোজোম ব্যবহার করে প্রযুক্তিটি উন্নত করার পর গবেষকরা সবুজ আলোকিত (fluorescent) হওয়ার জন্য জিনগতভাবে পরিবর্তিত ধেড়ে ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালান। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে গভীর হিমায়িত অবস্থায় সংরক্ষিত একটি ধেড়ে ইঁদুরের লেজের রক্তকোষ থেকে তারা নমুনা সংগ্রহ করেন এবং সফলভাবে এমন নেংটি ইঁদুরের ভ্রূণীয় স্টেম সেল তৈরি করেন, যাতে ওই ধেড়ে ইঁদুরের একটি অতিরিক্ত ক্রোমোজোম ছিল।
পরে এসব স্টেম সেল স্বাভাবিক নেংটি ইঁদুরের ভ্রূণে প্রবেশ করিয়ে স্ত্রী নেংটি ইঁদুরের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। এর ফলে কাইমেরিক (chimeric) প্রাণী তৈরি হয়, যাদের কিছু কোষে ধেড়ে ইঁদুরের ক্রোমোজোম রয়েছে। বাহ্যিকভাবে তারা সাধারণ নেংটি ইঁদুরের মতোই দেখায়। তবে অতিবেগুনি (UV) আলোয় তাদের কিছু কোষ মূল ধেড়ে ইঁদুরের মতো সবুজ আলো বিকিরণ করে।
গবেষক দল এমন নেংটি ইঁদুর তৈরিরও চেষ্টা করেছে, যাদের শরীরের প্রতিটি কোষে অতিরিক্ত ধেড়ে ইঁদুরের ক্রোমোজোম থাকবে। কিন্তু এখনও তারা সফল হয়নি। আরও একটি সীমাবদ্ধতা হলো, বর্তমানে প্রযুক্তিটি শুধুমাত্র ধেড়ে ইঁদুরের ৯ নম্বর ক্রোমোজোমের ক্ষেত্রেই কাজ করছে। অন্য ক্রোমোজোম ব্যবহার করলে ডিম্বাণু আর ভ্রূণে পরিণত হয় না।
ওয়াকায়ামা বলেন, “সফলতার হার বাড়ানোর জন্য আমরা বিভিন্ন পদ্ধতি পরীক্ষা করছি।”
সম্ভবত অন্য ক্রোমোজোমগুলোর কিছু জিন ভ্রূণের স্বাভাবিক বিকাশে বিঘ্ন ঘটায়। যদি এমনটাই হয়ে থাকে, তাহলে গবেষকদের অতিরিক্ত ক্রোমোজোমের কিছু জিন নিষ্ক্রিয় করতে হতে পারে। স্তন্যপায়ী প্রাণীর স্ত্রী কোষে যেমন দুটি X ক্রোমোজোমের একটি স্বাভাবিকভাবেই নিষ্ক্রিয় থাকে, তেমন একটি কৌশল ব্যবহার করা হতে পারে। তবে ওয়াকায়ামা আশা করছেন, শেষ পর্যন্ত হয়তো এর প্রয়োজন হবে না।
তার দল ইতোমধ্যে একটি চিড়িয়াখানা থেকে সংরক্ষিত হাতির টিস্যুর নমুনা সংগ্রহ করেছে। পাশাপাশি তারা সেই গবেষক দলের সঙ্গেও আলোচনা করছেন, যারা ২৮ হাজার বছর পুরোনো ‘ইউকা’ (Yuka) নামের একটি ম্যামথের কোষীয় নিউক্লিয়াস বের করে বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হয়েছিল।
প্রাচীন ম্যামথ কোষ ব্যবহার করে সরাসরি ক্লোনিং করা সম্ভব নয়, কারণ সেগুলোর ডিএনএ অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত। তবে ওয়াকায়ামা মনে করেন, পৃথক ক্রোমোজোম উদ্ধার করা গেলে সেগুলো জীবিত কোষে স্থানান্তর করে অধ্যয়ন করা সম্ভব হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা Revive & Restore-এর বেন নোভাক বলেন, “একটি সফল স্থানান্তরও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। বিশেষ করে প্যাসেরিন পাখিদের ক্ষেত্রে এই গবেষণার অনেক মূল্য রয়েছে।”
প্যাসেরিন পাখি হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাখি গোষ্ঠীগুলোর একটি, যার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি পাখি প্রজাতি অন্তর্ভুক্ত। এদের ক্ষেত্রে ত্বক ও পেশির মতো দেহকোষ গঠনের সময় একটি বিশেষ ক্রোমোজোম হারিয়ে যায়। এই ক্রোমোজোম কেবল ডিম্বাণু ও শুক্রাণু তৈরির প্রজনন কোষে থেকে যায়।
হাওয়াইয়ান পোওউলি ছিল এমনই একটি প্যাসেরিন পাখি। কিন্তু সংরক্ষিত নমুনা হিসেবে কেবল অপ্রজননশীল পুরুষ টিস্যুই পাওয়া গেছে। ফলে একে ফিরিয়ে আনতে হলে ঘনিষ্ঠ আত্মীয় প্রজাতি থেকে দুটি অতিরিক্ত ক্রোমোজোম যোগ করতে হবে। এর মধ্যে একটি হলো শুধুমাত্র প্রজনন কোষে থাকা ক্রোমোজোম, আরেকটি হলো স্ত্রী পাখিদের W ক্রোমোজোম।
নোভাক বলেন, “এর ফলে পুরোপুরি বিশুদ্ধ প্রাণী তৈরি হবে না, বরং আংশিক সংকর প্রাণী তৈরি হবে। তবুও প্রজাতিটিকে পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ তৈরি হবে।”
যদিও অতিরিক্ত ক্রোমোজোমসহ জীবন্ত প্রাণী তৈরির ক্ষেত্রে ওয়াকায়ামার দল প্রথম নয়। ২০২২ সালে জাপানের আরেকটি গবেষক দল মানব ক্রোমোজোম ২১ বহনকারী ধেড়ে ইঁদুর তৈরি করেছিল, যাতে ডাউন সিনড্রোম নিয়ে গবেষণা করা যায়। তবে সেই প্রযুক্তিতে ব্যাপক জিনগত পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়েছিল, যা সংরক্ষণমূলক কাজে ব্যবহার করা কঠিন।
নোভাকের মতে, প্রজননের সঙ্গে সম্পর্কিত অতিরিক্ত ক্রোমোজোম হয়তো আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি প্রাণীতে রয়েছে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন বায়োব্যাংকে সংরক্ষিত অনেক টিস্যু নমুনা হয়তো গুরুত্বপূর্ণ এসব ক্রোমোজোম ছাড়া জমা রাখা হয়েছে।
———
Resurrection of chromosomes from frozen animals by single chromosome transfer into mouse oocytes. Sci Rep (2026).
DOI: 10.1038/s41598-026-55500-1
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



