গুয়াতেমালার প্রাচীন মায়া নগরী জুলতুন (Xultun)-এর একটি দেয়ালে খোদাই করা গণিতের সূত্র প্রথমবারের মতো এক গুরুত্বপূর্ণ মায়া গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীর নাম প্রকাশ করেছে। গবেষকদের মতে, “সাক তাহন ওয়াক্স” (Sak Tahn Waax), যার অর্থ “সাদা বুকের শিয়াল” (White-Chested Fox), ছিলেন এমন একজন বিদ্বান, যাঁর গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের দক্ষতা ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ গণিতবিদদের সঙ্গে তুলনা করার মতো।
১৪ জুলাই, ২০২৬ Antiquity জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় নিউইয়র্কের স্কিডমোর কলেজের প্রত্নতত্ত্ববিদ হিদার হার্স্ট (Heather Hurst) এবং তাঁর সহকর্মীরা জুলতুনের একটি কক্ষ থেকে পাওয়া একটি গাণিতিক লেখার বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছেন। এই কক্ষটি প্রথম ২০১১ সালে খনন করা হয়েছিল।
কক্ষটির দেয়ালে মানুষের ছবি এবং মায়া হায়ারোগ্লিফিক লিপি আঁকা রয়েছে। এসব লেখার মধ্যে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ক্যালেন্ডারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি নানা গাণিতিক হিসাবও রয়েছে। মায়ারা এসব ক্যালেন্ডার ব্যবহার করত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সময় নির্ধারণে, যেমন নতুন রাজার অভিষেক কবে হবে।
হার্স্ট ও তাঁর সহকর্মীদের মতে, খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এই কক্ষটি সম্ভবত লিপিকারদের কর্মশালা ছিল। এখানেই তারা হাতে লেখা মায়া পাণ্ডুলিপি বা কোডেক্স (Codex) তৈরি করতেন।
গবেষকেরা বিশেষভাবে “টেক্সট ১৯” (Text 19) নামে পরিচিত একগুচ্ছ হায়ারোগ্লিফ বিশ্লেষণ করেছেন। হার্স্ট বলেন, এই লেখায় এমনভাবে একাধিক ক্যালেন্ডার পদ্ধতির পারস্পরিক সম্পর্ক দেখানো হয়েছে, যা আগে কোনো মায়া লেখায় দেখা যায়নি।
তিনি বলেন, “আমার মনে হয় এটা ছিল নিজের গণিত দক্ষতা দেখানোর এক দারুণ উদাহরণ। কেউ যেন বলছে, ‘আমি এমন এক অসাধারণ গাণিতিক বিন্যাস খুঁজে পেয়েছি, যা লিখে রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ।’ এক কথায়, যেন নিজের প্রতিভার ঘোষণা।”
ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া ডর্নসাইফের প্রত্নতত্ত্ববিদ এরিক হেলার (Eric Heller) বলেন, “এই আবিষ্কার প্রমাণ করে, মায়ারা অত্যন্ত মেধাবী, সৃজনশীল এবং জ্ঞানপিপাসু মানুষ ছিল। তারা শেখাত, শিখত এবং অনেক সময় কোনো ব্যবহারিক প্রয়োজন ছাড়াই শুধুমাত্র জ্ঞানের আনন্দের জন্যও গণিত নিয়ে কাজ করত।”
উন্মোচিত হলো এক গণিতবিদের পরিচয়
টেক্সট ১৯ হলো ইংরেজি “L” অক্ষরের মতো আকৃতির ১১টি হায়ারোগ্লিফের একটি ছোট টিম, যার মোট উচ্চতা প্রায় ১০ সেন্টিমিটার। গবেষকেরা দেখেছেন, প্রথম ৯টি হায়ারোগ্লিফে মায়া ক্যালেন্ডার এবং জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক চক্রের তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে।
এই সূত্রটি দেখায়, কীভাবে ২,৯২০ দিনের একটি চক্রকে মায়াদের ব্যবহৃত বিভিন্ন ক্যালেন্ডার এককে ভাগ করা যায়।
২,৯২০ দিনের এই চক্রটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ এটি দুটি গুরুত্বপূর্ণ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক চক্রকে একত্রে যুক্ত করে। এটি একদিকে শুক্র গ্রহের পাঁচটি পূর্ণ চক্রের (প্রতিটি ৫৮৪ দিন) সমান, অন্যদিকে সূর্যের আটটি বছরের (প্রতিটি ৩৬৫ দিন) সমান।
কিন্তু টেক্সট ১৯ এখানেই থেমে যায়নি। একই ২,৯২০ দিনকে মায়াদের আরও কয়েকটি সময় এককের সঙ্গেও সম্পর্কিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উইনাল (Uinal), যেখানে একটি মাস ২০ দিনের; তজলকিন (Tzolkin), ২৬০ দিনের পবিত্র ধর্মীয় ক্যালেন্ডার; তুন (Tun), যা ৩৬০ দিনের একটি বছর; এবং মঙ্গল গ্রহের ৭৮০ দিনের বছর।
হার্স্ট বলেন, “এটা একেবারে খাঁটি গণিতপ্রেমীদের মতো হিসাব।”
তিনি আরও জানান, লেখাগুলো পড়া কঠিন ছিল, কারণ সেখানে সম্পূর্ণ তারিখ লেখা হয়নি। বরং সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহার করা হয়েছে। “তারা এমনভাবে লিখেছে, যেখানে একটি চিহ্নের প্রথম অংশ লেখা হয়েছে, আর পরের অংশটি পাঠকের বোঝার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।”
এত দিন পর্যন্ত এই ধরনের জটিল গাণিতিক হিসাবের পেছনে থাকা মায়া গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের পরিচয় অজানাই ছিল।
কিন্তু টেক্সট ১৯-এর শেষের আগের হায়ারোগ্লিফে গবেষকেরা “এমনটাই বলেন” অর্থবোধক একটি বাক্যাংশ খুঁজে পান। এর পরের এবং শেষ হায়ারোগ্লিফে লেখা ছিল “সাক তাহন ওয়াক্স” নামটি।
এতে ধারণা করা হচ্ছে, এই ব্যক্তি হয় নিজেই এই গণনা করেছিলেন, অথবা অন্তত এই গাণিতিক ধারণার কৃতিত্ব তাঁর নামে দেওয়া হয়েছে।
ক্রেডিট: G. Ware/San Bartolo-Xultun Regional Archaeological Project
হার্স্ট বলেন, “আমরা নিশ্চিত, এটি একজন পুরুষের নাম। কারণ নামটির আগে নারীদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত বিশেষ উপসর্গ নেই।”
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান্তা বারবারার নৃতত্ত্ববিদ জেরার্দো আলদানা (Gerardo Aldana) বলেন, এই নামের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে বোঝা যায়, মায়া সমাজে গণিতবিদদেরও শিল্পীদের মতো স্বীকৃতি দেওয়া হতো।
ইতিহাসের মহান গণিতবিদদের সমকক্ষ
হার্স্ট ও তাঁর সহকর্মীদের মতে, এই গবেষণা প্রমাণ করে সাক তাহন ওয়াক্সকে ইতিহাসের বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতবিদদের কাতারেই রাখা উচিত।
তাঁরা তাঁর তুলনা করেছেন আর্কিমিডিস (Archimedes), ক্লডিয়াস টলেমি (Claudius Ptolemy) এবং মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল খোয়ারিজমি (Muḥammad ibn Mūsā al Khwārizmī)-এর মতো কিংবদন্তি পণ্ডিতদের সঙ্গে।
আলদানা বলেন, জুলতুনের এই লেখাগুলো এবং একাদশ বা দ্বাদশ শতাব্দীর ড্রেসডেন কোডেক্স (Dresden Codex)-এর গাণিতিক জ্ঞান সমসাময়িক অন্যান্য সভ্যতার গণিতের সঙ্গে তুলনা করলে সত্যিই বিস্ময়কর।
মায়ারা স্থানীয় মানভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতি (Positional Notation), জটিল গাণিতিক ক্রিয়া, বীজগাণিতিক সম্পর্ক, ঋণাত্মক সংখ্যা এবং গুণনীয়ক ব্যবহারের মতো ধারণাগুলো ভালোভাবেই বুঝত।
তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা দেখায় তারা জ্যামিতিকে একইভাবে বিকশিত করেছিল।
আলদানা বলেন, “তারা বুঝতে পারেনি যে জ্যামিতিক মডেল ব্যবহার করলে শুধুমাত্র বীজগণিতের ওপর নির্ভর করার তুলনায় সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ অনেক বেশি নির্ভুলভাবে পূর্বাভাস দেওয়া যায়।”
তিনি মনে করেন, এর একটি বড় কারণ ছিল ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা।
তাঁর ভাষায়, সেই সময়ে মেসোআমেরিকা বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিল।
তিনি বলেন, “গ্রিকরা জ্যামিতি শিখেছিল মিশরীয়দের কাছ থেকে। ইসলামি বিশ্ব এবং ভারত গ্রিকদের কাছ থেকে গণিতের অনেক জ্ঞান গ্রহণ করেছিল। পরে ইউরোপ ইসলামি বিশ্বের মাধ্যমে সেই জ্ঞান অর্জন করে।”
“অর্থাৎ বিভিন্ন সভ্যতা একে অপরের সঙ্গে ধারণা আদানপ্রদান করেছে এবং জ্ঞানকে আরও এগিয়ে নিয়েছে। কিন্তু মেসোআমেরিকায় মূলত একটি সাংস্কৃতিক ধারার মধ্যেই এই বিকাশ ঘটেছিল। আমার ধারণা, এ কারণেই তাদের গণিত অন্য সভ্যতাগুলোর মতো একই পথে এগোয়নি।”
———
The identification and work of an eighth-century Maya mathematician. Antiquity (2026).
DOI: 10.15184/aqy.2026.10378
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



