মানুষের সবচেয়ে পুরোনো সঙ্গীদের মধ্যে কুকুর অন্যতম। ২৫ মার্চ, ২০২৬ এ Nature জার্নালে প্রকাশিত দুটি গবেষণাপত্রে এখন পর্যন্ত রেকর্ড করা সবচেয়ে প্রাচীন কুকুরের জিনোম শনাক্ত করা হয়েছে। এসব জিনোম পাওয়া গেছে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের অবশেষ থেকে।
যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড এবং তুরস্ক থেকে সংগৃহীত এই অবশেষগুলোর বয়স প্রায় ১৪ হাজার থেকে ১৬ হাজার বছর। এর ফলে কুকুরের জেনেটিক ইতিহাস আরও অন্তত ৫ হাজার বছর পেছনে চলে গেছে। গবেষণায় একটি প্রাচীন গৃহপালিত কুকুরের জনসংখ্যার (Canis lupus familiaris) অস্তিত্বও চিহ্নিত হয়েছে, যা পশ্চিম ইউরেশিয়া জুড়ে বিস্তৃত ছিল এবং বিভিন্ন শিকারি-সংগ্রাহক মানবগোষ্ঠী এই কুকুরগুলোকে লালন-পালন করত। আশ্চর্যের বিষয়, এই প্রাচীন কুকুরদের জিনগত বৈশিষ্ট্য এখনো আধুনিক কুকুরদের মধ্যে টিকে আছে।
এই গবেষণাগুলো সরাসরি বলতে পারে না, কোথায়, কখন এবং কেন মানুষ প্রথম কুকুরকে গৃহপালিত করেছিল। তবে অনেক গবেষকের মতে, এগুলো অনুসন্ধানের ক্ষেত্রকে অনেকটাই সংকুচিত করেছে। গবেষণায় আরও দেখা যায়, প্রাচীন মানুষেরা এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যাওয়ার সময় কুকুরকে সঙ্গে নিয়ে যেত এবং বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর মধ্যে কুকুরের আদান-প্রদানও হতো। জার্মানির মিউনিখের Ludwig Maximilian University-এর বিবর্তনীয় জেনেটিসিস্ট Lachie Scarsbrook বলেন, “মানুষ যখনই কোথাও গেছে, তারা তাদের কুকুরকে সঙ্গে নিয়েছে। আমরা একে ‘সুইস আর্মি ডগ’ বলি। কারণ তারা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ভূমিকায় সহজে মানিয়ে নিতে পারে।”
সামাজিক প্রাণী হিসেবে কুকুরের ইতিহাস
মানুষ বরফযুগে ধূসর নেকড়ে (Canis lupus) থেকে কুকুরকে গৃহপালিত করে। কিন্তু এত বছর ধরে প্রত্নতাত্ত্বিক ও জেনেটিক গবেষণা চললেও এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি, ঠিক কখন বা কোথায় এই প্রক্রিয়া ঘটেছিল, এমনকি কেন ঘটেছিল সেটিও পরিষ্কার নয়।
এই গবেষণার একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো, প্রাচীন হাড়ের টুকরো থেকে কুকুর আর নেকড়ের পার্থক্য নির্ধারণ করা। অনেক সময় খুব পুরোনো হাড়ের আকার দেখে কুকুর বলে মনে করা হলেও পরে ডিএনএ বিশ্লেষণে তা নেকড়ে হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, প্রায় ৩০ হাজার বছর পুরোনো কিছু হাড়কে আগে কুকুরের বলে ধারণা করা হয়েছিল, কিন্তু পরে জিনগত বিশ্লেষণে তা ভুল প্রমাণিত হয়। নতুন গবেষণার আগে সবচেয়ে পুরোনো কুকুরের ডিএনএ পাওয়া গিয়েছিল প্রায় ১১ হাজার বছর পুরোনো একটি জীবাশ্ম থেকে। জীবাশ্ম রাশিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে পাওয়া গিয়েছিলো।
এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে মিউনিখের Ludwig Maximilian University এবং লন্ডনের Natural History Museum-এর গবেষকেরা একটি দল গঠন করেন। তারা ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের Cheddar Gorge-এর Gough’s Cave থেকে সংগৃহীত সম্ভাব্য কুকুরের জীবাশ্ম এবং তুরস্কের Pınarbaşı নামের একটি স্থান থেকে পাওয়া অত্যন্ত ভঙ্গুর হাড় বিশ্লেষণ করেন। গবেষকদের মতে, এই হাড়গুলো দেখতে অনেকটা ফ্রিজ-ড্রাই করা কফির মতো ভঙ্গুর ছিল।
ডিএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, Pınarbaşı থেকে পাওয়া প্রায় ১৫,৮০০ বছর পুরোনো একটি নমুনা, যা দাঁতের গঠন দেখে একটি মাদি কুকুরছানার বলে শনাক্ত করা হয়েছে, এবং Gough’s Cave থেকে পাওয়া প্রায় ১৪,৩০০ বছর পুরোনো জীবাশ্ম, দুটিই স্পষ্টভাবে গৃহপালিত কুকুরের। এই দুটি কুকুরের জিনোম অত্যন্ত মিল ছিল, যা নির্দেশ করে যে গৃহপালিত কুকুর খুব দ্রুত ইউরোপ এবং পশ্চিম এশিয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল।
ক্রেডিট: Trustees of the Natural History Museum
এই দুই স্থানের মানুষের জীবনধারা ছিল ভিন্ন। গবেষণার সহলেখক, Natural History Museum-এর প্যালিওজেনেটিসিস্ট William Marsh বলেন, Pınarbaşı অঞ্চলের মানুষ মাছ ও ছোট পাখির ওপর নির্ভরশীল ছিল, আর Gough’s Cave-এর মানুষ মূলত স্থলভাগে শিকার করত। তবুও এই দুই ভিন্ন মানবগোষ্ঠীর মধ্যে একটি মিল ছিল। তারা তাদের কুকুরদেরকে মানুষের মতোই সম্মান দিত।
Gough’s Cave-এ পাওয়া কুকুরের খুলিতে অলংকারের মতো ছিদ্র করা ছিল, যা ওই স্থানে পাওয়া মানুষের খুলির পরিবর্তনের সঙ্গে মিল রয়েছে। ধারণা করা হয়, এসব পরিবর্তন ধর্মীয় বা আচারগত উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল, যার সঙ্গে আচারগত ক্যানাবলিজম সম্পর্ক থাকতে পারে। অন্যদিকে, Pınarbaşı-তে কুকুরের জীবাশ্মে ইচ্ছাকৃতভাবে মৃত মানুষের দেহের ওপর কবর দেওয়া হয়েছিল। আইসোটোপ বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, এই দুই জায়গার কুকুর মানুষের মতোই একই ধরনের খাবার খেত। Marsh বলেন, “চার হাজার কিলোমিটার দূরে থেকেও আমরা দেখি, এই কুকুরদের প্রায় একইভাবে আচরণ করা হয়েছে।”
এশিয়ায় উৎপত্তির সম্ভাবনা
দ্বিতীয় গবেষণাটি লন্ডনের Francis Crick Institute-এর গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। তারা শত শত সম্ভাব্য কুকুর ও নেকড়ের অবশেষ বিশ্লেষণ করে একটি উন্নত পদ্ধতি ব্যবহার করেন, যেখানে প্রাচীন ডিএনএকে মাইক্রোবিয়াল দূষণের মধ্য থেকে আলাদা করে শনাক্ত করা হয়। এই পদ্ধতির মাধ্যমে তারা ১৩০টির বেশি নমুনায় কুকুর ও নেকড়ের পার্থক্য নির্ণয় করতে সক্ষম হন।
এই বিশ্লেষণে তারা ইউরোপের শিকারি-সংগ্রাহক সমাজে বসবাসকারী ১৪টি প্রাচীন কুকুর শনাক্ত করেন। এর মধ্যে সুইজারল্যান্ডের Kesslerloch নামের একটি স্থান থেকে পাওয়া প্রায় ১৪,২০০ বছর পুরোনো একটি নমুনাও রয়েছে।
গবেষকেরা দেখেছেন, এই প্রাচীন ইউরোপীয় কুকুরদের জিনগত বৈশিষ্ট্য দীর্ঘ সময় ধরে টিকে ছিল। মধ্যপ্রাচ্য থেকে কৃষক জনগোষ্ঠীর আগমন এবং তাদের সঙ্গে আসা নতুন কুকুরের পরও এই বৈশিষ্ট্য বিলুপ্ত হয়নি। বরং আজকের ইউরোপীয় কুকুরের জাত, যেমন German shepherd-এর মধ্যেও এই বৈশিষ্ট্যের প্রভাব দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের Cornell University-এর কুকুর জেনেটিসিস্ট Adam Boyko বলেন, “কুকুরেরা কোন সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত তা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় না।”
Marsh-এর একটি প্রাথমিক, এখনো প্রকাশিত হয়নি এমন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, Kesslerloch-এর কুকুরটি Gough’s Cave-এর কুকুরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। এমনকি Pınarbaşı-এর কুকুরের সঙ্গে তাদের মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ প্রায় অভিন্ন। ফ্রান্সের University of Toulouse-এর প্যালিওজেনেটিসিস্ট Ludovic Orlando-এর মতে, এই তিনটি কুকুর সম্ভবত একটি একক বরফযুগীয় জনসংখ্যার অংশ ছিল, যা ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচজুড়ে বিস্তৃত ছিল। তিনি বলেন, “এটি আগে জানা ছিল না। এটি একটি বড় আবিষ্কার।”
Orlando মনে করেন, এই গবেষণাগুলো কুকুরের গৃহপালনের সঠিক উৎপত্তি সম্পর্কে খুব বেশি নতুন তথ্য দেয় না। তবে তিনি আশাবাদী যে, নতুন ডিএনএ শনাক্তকরণ পদ্ধতি ভবিষ্যতে আরও পুরোনো এবং খারাপভাবে সংরক্ষিত নমুনা বিশ্লেষণে সাহায্য করবে।
Boyko-এর মতে, এই গবেষণা এবং আগের অন্যান্য প্রমাণ একত্রে ইঙ্গিত দেয় যে কুকুরের প্রথম গৃহপালন সম্ভবত এশিয়াতেই ঘটেছে। ২০২২ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাচীন ও আধুনিক কুকুর এশিয়ার বরফযুগের নেকড়ের সঙ্গে ইউরোপীয় নেকড়ের তুলনায় বেশি ঘনিষ্ঠ। Boyko-এর নিজস্ব গবেষণাতেও দেখা গেছে, মধ্য এশিয়ার ‘গ্রাম্য কুকুর’ আধুনিক কুকুরের বৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
যুক্তরাজ্যের University of East Anglia-এর বিবর্তনীয় জেনেটিসিস্ট Anders Bergström বলেন, এখন মনে হচ্ছে ইউরোপে কুকুর প্রথম গৃহপালিত হয়নি। আগের একটি গবেষণায় বলা হয়েছিল, ইউরোপ ও এশিয়ায় আলাদাভাবে দুটি নেকড়ে জনগোষ্ঠী থেকে কুকুর গৃহপালিত হয়েছিল। কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, প্রাচীন ইউরোপীয় কুকুর এশীয় নেকড়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এখন দৃষ্টি এশিয়ার দিকে, যদিও এশিয়া একটি বিশাল অঞ্চল এবং সুনির্দিষ্ট স্থান এখনো নির্ধারণ করা যায়নি।
———
Dogs were widely distributed across western Eurasia during the Palaeolithic. Nature (2026).
DOI: 10.1038/s41586-026-10170-x
Genomic history of early dogs in Europe. Nature (2026).
DOI: 10.1038/s41586-026-10112-7
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



