ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানী মির ফয়সাল (Mir Faizal) নেতৃত্বাধীন একটি গবেষণা দল সাম্প্রতিক তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, সাধারণ আপেক্ষিকতা (General Relativity) এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সকে একত্রে ব্যাখ্যা করার মতো কোনো সর্বজনীন “Theory of Everything” সম্ভব নয়, অন্ততপক্ষে কোনো অ্যালগরিদমিক (algorithmic) পদ্ধতিতে নয়।
এই গবেষণাটি সম্প্রতি Journal of Holography Applications in Physics জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
এর সরাসরি অর্থ হলো, যদি মহাবিশ্বকে কোনো সিমুলেশন হিসেবে ভাবা হয়, তবে সেটি সম্ভব নয়, কারণ সিমুলেশন সবসময় অ্যালগরিদমের ভিত্তিতে কাজ করে।
ফয়সাল বলেন, “আমরা প্রমাণ করেছি যে, কোয়ান্টাম গ্রাভিটির কোনো কম্পিউটেশনাল (computational) তত্ত্ব দিয়ে বাস্তবতার সব দিক ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। তাই শুধু কম্পিউটেশন বা অ্যালগরিদমিক পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে কোনো পূর্ণাঙ্গ এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ ‘Theory of Everything’ তৈরি করা যায় না। বরং এটি এমন এক নন-অ্যালগরিদমিক (non-algorithmic) বোঝাপড়ার প্রয়োজন পড়ে, যা কোয়ান্টাম গ্রাভিটির কম্পিউটেশনাল নিয়মগুলোর চেয়েও মৌলিক, এমনকি স্থানকাল (spacetime)-এরও ঊর্ধ্বে।”
দীর্ঘদিন ধরে পদার্থবিদদের সবচেয়ে কঠিন সমস্যাগুলোর একটি হলো, মসৃণ স্থানকালের গঠন (spacetime) এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অনিশ্চিত জগৎকে একসঙ্গে মিলিয়ে দেখা। মহাবিশ্ব নিঃসন্দেহে কাজ করছে, কিন্তু একটির জন্য ব্যবহৃত গণিত অপরটির ক্ষেত্রে ভেঙে পড়ে।
এই সমস্যার সমাধানে বহু পদার্থবিদ দীর্ঘদিন ধরে ‘কোয়ান্টাম গ্রাভিটি’ বা ‘Theory of Everything’-এর সন্ধান করেছেন। এটা এমন এক গাণিতিক কাঠামো যা আপেক্ষিকতা এবং কোয়ান্টাম তত্ত্বের মাঝে নির্বিঘ্ন সেতুবন্ধন তৈরি করবে।
ফয়সাল ও তার সহকর্মীরা এই অনুসন্ধানে প্রচলিত প্রচেষ্টাগুলোর দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যেমন, স্ট্রিং থিওরি (String Theory) ও লুপ কোয়ান্টাম গ্রাভিটি (Loop Quantum Gravity)। এসব তত্ত্বে ধারণা করা হয়, স্থানকাল ও কোয়ান্টাম ক্ষেত্র (quantum fields) আসলে “তথ্যের” (information) ওপর ভিত্তি করে গঠিত, যাকে মার্কিন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ জন হুইলার (John Wheeler) সংক্ষেপে বলেছিলেন, “it from a bit”। কিন্তু ফয়সালদের মতে, “bits” থেকে “its” তৈরি হওয়া সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, “আমরা গণিতের অসম্পূর্ণতা (incompleteness) ও সংজ্ঞাহীনতার (undefinability) তত্ত্ব ব্যবহার করে দেখিয়েছি যে, শুধুমাত্র কম্পিউটেশনের মাধ্যমে বাস্তবতার একটি পূর্ণাঙ্গ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ বর্ণনা পাওয়া অসম্ভব। এটি এমন এক অন্যালগরিদমিক বোঝাপড়া দাবি করে, যা সংজ্ঞা অনুসারে অ্যালগরিদমিক কম্পিউটেশনের বাইরে এবং তাই সিমুলেট করা যায় না। সেই কারণেই এই মহাবিশ্ব কোনো সিমুলেশন হতে পারে না।”
এই ধারণা যাচাই করতে তারা তিনজন প্রখ্যাত গণিতবিদ, কার্ট গ্যোডেল (Kurt Gödel), আলফ্রেড টারস্কি (Alfred Tarski) ও গ্রেগরি চেইটিন (Gregory Chaitin)-এর তত্ত্বগুলো ব্যবহার করেছেন। এই তিনজনই দেখিয়েছিলেন যে, গণিত ও যুক্তির মাধ্যমে মহাবিশ্ব বোঝার আমাদের ক্ষমতারও একটি সীমা রয়েছে।
১৯৩১ সালে গ্যোডেলের বিখ্যাত Incompleteness Theorem প্রমাণ করে যে, কোনো সামঞ্জস্যপূর্ণ গাণিতিক পদ্ধতিতেও এমন কিছু সত্য থাকতে পারে, যা সেই পদ্ধতির নিজস্ব নিয়মে প্রমাণ করা সম্ভব নয়। টারস্কির ১৯৩৩ সালের Undefinability Theorem বলেছে, কোনো গাণিতিক ব্যবস্থাই নিজের সত্য নির্ধারণ করতে পারে না।
এরপর ১৯৬০-এর দশকে চেইটিন দেখান, অ্যালগরিদমিক পদ্ধতিতে বর্ণনা করার জটিলতারও একটি সীমা আছে, কোনো সূত্র দিয়ে সবকিছু নির্ধারণ করা যায় না।
এই যুক্তিগুলোর আলোকে গবেষকরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, পদার্থবিজ্ঞান নিজেই সম্পূর্ণভাবে কম্পিউটেবল নয়। তাই তারা প্রস্তাব করেছেন, একটি “মেটা-স্তর” (meta-layer) যোগ করে এমন একটি কাঠামো তৈরি করা যায়, যাকে বলা যেতে পারে Meta Theory of Everything (MToE), যা অ্যালগরিদমিক স্তরের ঊর্ধ্বে অবস্থান করবে।
এই “মেটা স্তর” মহাবিশ্বের সত্য নির্ধারণ করবে গাণিতিক নিয়মের বাইরে থেকে, ফলে ব্ল্যাক হোলের ইনফরমেশন-প্যারাডক্সের মতো রহস্যগুলোও অনুসন্ধান করা সম্ভব হবে, কোনো গাণিতিক নিয়ম ভঙ্গ না করেই।
এবং সবশেষে, এই তত্ত্ব একেবারে শেষ করে দেয় সেই দীর্ঘ বিতর্ক, “আমরা কি সত্যিই বাস্তব, নাকি সিমুলেশন?”
ফয়সাল বলেন, “যেকোনো সিমুলেশনই অ্যালগরিদমিক, সেটিকে প্রোগ্রাম করা নিয়ম মেনে চলতে হয়। কিন্তু যেহেতু বাস্তবতার মৌলিক স্তরই নন-অ্যালগরিদমিক বোঝাপড়ার ওপর ভিত্তি করে, তাই মহাবিশ্ব কখনোই কোনো সিমুলেশন হতে পারে না।”
———
Consequences of Undecidability in Physics on the Theory of Everything. Journal of Holography Applications in Physics (2025).
DOI: 10.22128/jhap.2025.1024.1118
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


