নিউরোসায়েন্টিস্টরা প্রথমবারের মতো দেখতে পেয়েছেন, মস্তিষ্ক যখন নিজেই নিজের চিন্তার বিষয়ে সচেতন হয় — যাকে “conscious perception” বলা হয় — তখন মস্তিষ্কের গভীরে থাকা কিছু কাঠামো কীভাবে সক্রিয় হয়।
মস্তিষ্ক সব সময়ই নানা রকম দৃশ্য, শব্দ এবং অন্যান্য উত্তেজনার দ্বারা বোমাবর্ষণের মতো আক্রান্ত হতে থাকে, কিন্তু মানুষ কেবলমাত্র আশপাশের জগতের এক ক্ষুদ্র অংশ নিয়েই সচেতন থাকে — যেমন একটি চকলেটের স্বাদ বা কারও কণ্ঠস্বরের শব্দ। গবেষকরা অনেক আগে থেকেই জানেন যে, মস্তিষ্কের বাইরের স্তর যাকে “cerebral cortex” বলা হয়, তা এই সচেতন চিন্তা অনুভব করার প্রক্রিয়ায় জড়িত।
তবে মস্তিষ্কের গভীরের কাঠামোগুলোর ভূমিকা বোঝা বরাবরই কঠিন ছিল, কারণ সেগুলোতে পৌঁছাতে হলে লিথার সার্জারির প্রয়োজন হয়। আর প্রাণীদের উপর এ ধরনের পরীক্ষা চালানোও বেশ জটিল। তবে গবেষকরা বলছেন, এই অঞ্চলগুলো নিয়ে গবেষণা করলে তারা মস্তিষ্কের বাইরের আবরণ ছাড়িয়ে চেতনা নিয়ে আরও বিস্তৃত তত্ত্ব তৈরি করতে পারবেন।
চেতন না অবচেতন
গত ৩ এপ্রিল, ২০২৫ এ Science জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায়, বেইজিং নর্মাল ইউনিভার্সিটির নিউরোসায়েন্টিস্ট মিন্শা ঝাং থ্যালামাস নামক মস্তিষ্কের একটি অংশের উপর নজর দেন। মস্তিষ্কের কেন্দ্রে থাকা এই অঞ্চলটি সংবেদনশীল তথ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং কাজের স্মৃতির সঙ্গে জড়িত, এবং ধারণা করা হয় এটি কনশাসনেস বা চেতনা উপলব্ধিতে ভূমিকা রাখে।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা আগে থেকেই দীর্ঘস্থায়ী এবং তীব্র মাথাব্যথার চিকিৎসার জন্য থ্যালামাসে সরু ইলেকট্রোড ইমপ্ল্যান্ট করিয়ে নিয়েছেন। এই সুযোগে ঝাং এবং তার সহকর্মীরা তাদের মস্তিষ্কের সংকেত বিশ্লেষণ করে সচেতনতার পরিমাপ করতে পেরেছিলেন।
অংশগ্রহণকারীদের বলা হয়েছিল, একটি নির্দিষ্ট উপায়ে চোখ ঘোরাতে — নির্ভর করে তারা পর্দায় একটি আইকন ফ্ল্যাশ করতে দেখেছেন কি না। আইকনটি এমনভাবে ডিজাইন করা ছিল, যাতে এটি অংশগ্রহণকারীদের চোখে ধরা পড়ে কেবল অর্ধেক সময়েই।
এই কাজ চলাকালে গবেষকরা থ্যালামাস এবং কর্টেক্স সহ মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের স্নায়বিক কার্যকলাপ রেকর্ড করেন। সিডনির ইউনিভার্সিটি অব সিডনির সিস্টেম নিউরোসায়েন্টিস্ট ক্রিস্টোফার হোয়াইট বলেন, এই প্রথমবার এমন একটি গবেষণায় মস্তিষ্কের একাধিক অঞ্চলের স্নায়বিক কার্যকলাপ একসঙ্গে রেকর্ড করা হয়েছে যা সচেতনতা বিজ্ঞানের জন্য প্রাসঙ্গিক। তার মতে, “এই কাজটা সত্যিই অসাধারণ,” কারণ এটি গবেষকদের বিভিন্ন অঞ্চলে কার্যকলাপের সময়কাল কেমন তা তুলনা করার সুযোগ দিয়েছে।
প্রহরী হিসেবে থ্যালামাস
যখন অংশগ্রহণকারীরা আইকনটি দেখেছিলেন, তখন তাদের থ্যালামাস এবং প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে যে কার্যকলাপ দেখা গিয়েছে, তা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন সেই সময়ের কার্যকলাপ থেকে যখন তারা আইকনটি দেখেননি। সচেতন অবস্থায় থ্যালামাসের কার্যকলাপ কর্টেক্সের তুলনায় আগে শুরু হয়েছিল এবং বেশি তীব্র ছিল, এবং দুটি অঞ্চলের কার্যকলাপ একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। সিডনির ইউনিভার্সিটির সিস্টেম নিউরোসায়েন্টিস্ট ম্যাক শাইন বলেন, এটি ইঙ্গিত দেয় যে থ্যালামাস একটি ফিল্টার হিসেবে কাজ করে — কোন চিন্তাগুলো চেতনায় আসে আর কোনগুলো আসে না, তা নিয়ন্ত্রণ করে।
পূর্বের প্রাণী-ভিত্তিক গবেষণাগুলোও এই ফলাফলকে সমর্থন করে। ২০২০ সালের একটি গবেষণায়, গবেষকরা চুম্বকের সাহায্যে ইঁদুরের গোঁফকে এমনভাবে নাড়িয়েছিলেন যাতে ইঁদুররা সেটি অর্ধেক সময় টের পেত। ইঁদুরদের শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যদি তারা গোঁফের নড়াচড়া অনুভব করে, তবে পানির উৎস থেকে একটি চুমুক নিতে হবে। দেখা গেছে, যখন ইঁদুররা সেই নড়াচড়া টের পেত, তখন তাদের সেরিব্রাল কর্টেক্সের নির্দিষ্ট কোষ সক্রিয় হতো, এবং সেই সংকেত মস্তিষ্কের গভীর অংশে — থ্যালামাস সহ — প্রেরিত হতো।
এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে — এই পরীক্ষাটি কি আসলেই সচেতন অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িত স্নায়বিক কার্যকলাপকে ধরেছে, নাকি শুধুই কোনো উত্তেজকের প্রতি মনোযোগের প্রতিক্রিয়া রেকর্ড করেছে যা সচেতনভাবে অনুভব না-ও করা হতে পারে?
ঝাং ভবিষ্যতে আরও মানুষের উপর গবেষণা চালানোর এবং ম্যাকাক বানরের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ বিশদভাবে পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা করছেন।
———
Human high-order thalamic nuclei gate conscious perception through the thalamofrontal loop, Science (2025)
DOI: 10.1126/science.adr3675
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


