ইউরেনাসকে প্রদক্ষিণ করা এক ক্ষুদ্র ও ম্লান প্রাকৃতিক উপগ্রহ বা চাঁদ আবিষ্কৃত হয়েছে। এর ফলে এই গ্রহের মোট উপগ্রহের সংখ্যা দাঁড়ালো ২৯-এ। ইউরেনাসের অধিকাংশ চাঁদের নাম উইলিয়াম শেকসপিয়ারের রচনার চরিত্র থেকে নেওয়া হয়েছে, আর বিজ্ঞানীরা এখন আলোচনা করছেন নতুন চাঁদটির নাম কোন চরিত্র থেকে নেওয়া যায়।
এই নতুন চাঁদটি আবিষ্কার করেছেন সাউথওয়েস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মারিয়াম এল মুতামিদ নেতৃত্বাধীন এক গবেষক দল। তারা জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) ব্যবহার করে গত ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ এ তোলা ১০টি লং এক্সপোজারের ইনফ্রারেড ছবি বিশ্লেষণ করে এটি খুঁজে পান।
বর্তমানে এর প্রাথমিক নাম দেওয়া হয়েছে S/2025 U 1। তবে সম্ভবত এটি শেকসপিয়ারের কোনো নাটকের চরিত্রের নামে নামকরণ করা হবে, যেমন ইউরেনাসের ২৭টি চাঁদের নামকরণ করা হয়েছে। এই নামকরণের নিয়ম শুরু হয়েছিল ইউরেনাসের প্রথম দুই চাঁদ, টাইটানিয়া ও ওবেরন, ১৭৮৭ সালে আবিষ্কারের পর থেকে।
নতুন নামটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করতে হবে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন (IAU) কর্তৃক, যেটি মহাজাগতিক বস্তুদের অফিসিয়াল নামকরণের দায়িত্বে থাকে। গবেষণা দলের সদস্য ও সেতি ইনস্টিটিউটের মার্ক শোয়ালটার জানিয়েছেন, নাম নিয়ে আলোচনা হয়েছে বটে, তবে এখনো কোনো শর্টলিস্ট তৈরি হয়নি।
শোয়ালটার বলেন, এত ছোট ও অন্ধকার একটি উপগ্রহ শনাক্ত করা বেশ কঠিন ছিল। তার ভাষায়, “এটা ঠিক যেন গাড়ির হেডলাইটের আলোয় তাকিয়ে একটি মাছি খুঁজে বের করার মতো।” তিনি আরও বলেন, “জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ সত্যিই এক অসাধারণ যন্ত্র, যা এর আগে তৈরি হওয়া অন্য যেকোনো টেলিস্কোপের তুলনায় বহুগুণ বেশি সংবেদনশীল।”
তিনি আশা প্রকাশ করেন যে ইউরেনাসের আরও চাঁদ আবিষ্কৃত হবে। “আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি। বেশ যুক্তিসঙ্গতভাবে বলা যায়, আরও উপগ্রহ সেখানে লুকিয়ে আছে। আমরা অনেক দিন ধরেই সন্দেহ করেছি যে ইউরেনাসের রিং সিস্টেমের ভেতরে কিছু ‘শেফার্ড মুন’ থাকতে পারে, যেগুলো রিংয়ের কণাগুলোকে একত্রে রাখে। এখনো সেগুলো পাওয়া যায়নি, তবে আমরা বিশেষভাবে সেগুলোকেই খুঁজছি।”
এল মুতামিদ বলেন, ইউরেনাসের রিংয়ের তীক্ষ্ণ গঠনই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আরও অজানা চাঁদ রয়েছে, যেগুলো রিংয়ের গঠনে সাহায্য করেছে। “অবশ্যই আরও অনেক ছোট চাঁদ সেখানে আছে, শুধু আমাদের সনাক্ত করার অপেক্ষায়। হয়তো জেমস ওয়েব সেগুলো খুঁজে পাবে, তবে ২০৪৪ সালে যদি ইউরেনাস অরবিটার ও প্রোব মিশন শুরু হয়, তখন আরও অনেকগুলো একসাথে আবিষ্কৃত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এর মধ্যে অনেক চাঁদ এতটাই ছোট যে বর্তমান রেজোলিউশনের কারণে আমরা এখনো তাদের দেখতে পাচ্ছি না।”
নতুন চাঁদ S/2025 U 1-এর ব্যাস প্রায় ১০ কিলোমিটার বলে অনুমান করা হচ্ছে। এত ছোট হওয়ায় এটি ভয়েজার-২ মহাকাশযানের ক্যামেরায় ধরা পড়েনি। ১৯৭৭ সালে উৎক্ষেপিত ভয়েজার-২ ইউরেনাসের সবচেয়ে কাছে পৌঁছেছিল ১৯৮৬ সালে, মাত্র ৮০,০০০ কিলোমিটার দূরত্বে। এখন পর্যন্ত সেটিই পৃথিবী থেকে পাঠানো কোনো মহাকাশযান যা ইউরেনাসের সবচেয়ে কাছাকাছি গিয়েছে।
এই নতুন চাঁদটি ইউরেনাসের ভেতরের রিংগুলোর প্রান্তে অবস্থান করছে, গ্রহটির কেন্দ্র থেকে প্রায় ৫৬,২৫০ কিলোমিটার দূরে। এটি অবস্থান করছে অন্য দুটি চাঁদ, ওপেলিয়া ও বিয়াঙ্কার কক্ষপথের মাঝামাঝি।
নাসা জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের জন্য একটি “General Observer” প্রোগ্রাম চালায়, যেখানে সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীরা আবেদন করতে পারেন নির্দিষ্ট লক্ষ্যের জন্য টেলিস্কোপের উন্নত সেন্সর ব্যবহার করতে। এল মুতামিদ JWST-এর হাই রেজোলিউশনের ইনফ্রারেড সেন্সর NIRCam ব্যবহার করে ইউরেনাসের রিং গবেষণার আবেদন করেছিলেন। সেই গবেষণার ফলেই আবিষ্কৃত হলো এই নতুন ক্ষুদ্র চাঁদ।
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


