আমরা যখন এক টুকরো চকলেট কামড় বাসাই, তখন ভেতরে লুকানো ভিন্নধর্মী ফলের ঘ্রাণ, বাদামের মতো নরম স্বাদ আর মাটির মতো গভীর সুবাস একসাথে মিশে যায়। কিন্তু এই জটিল স্বাদ আসলে কোথা থেকে আসে? নতুন এক গবেষণা জানাচ্ছে, এর আসল রহস্য লুকিয়ে আছে কোকো বীজের ফারমেন্টেশন বা গাঁজন প্রক্রিয়ায়।
সাধারণত কোকো ফারমেন্টেশন প্রাকৃতিকভাবে ঘটে। বীজগুলো কাঠের বাক্স বা ঝুড়িতে রাখা হয় এবং পরিবেশ থেকে আসা নানা ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাস নিজেরাই কাজ শুরু করে। এই প্রক্রিয়ার সময় অণুজীবরা বীজের ভেতরে রাসায়নিক রূপান্তর ঘটায়, যা চকলেটকে তিক্ত আর কষাভাব থেকে মুক্ত করে এনে দেয় নরম, জটিল এবং মিষ্টি স্বাদ।
গত ১৮ আগস্ট, ২০২৫ Nature Microbiology জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ফারমেন্টেশনের সময় pH, তাপমাত্রা আর উপস্থিত জীবাণু মিলেই ঠিক করে চকলেটের স্বাদ কেমন হবে। এমনকি তারা পরীক্ষাগারে কৃত্রিমভাবে আদর্শ ফারমেন্টেশনের পরিবেশ তৈরি করে উচ্চমানের চকলেটের স্বাদও পুনরুৎপাদন করতে পেরেছেন।
গবেষণার সহলেখক এবং যুক্তরাজ্যের নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ জেনেটিসিস্ট ডেভিড গোপলচান বলেন, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবিষ্যতে গ্রাহকদের জন্য নতুন নতুন অনন্য স্বাদের চকলেট তৈরি সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের নেব্রাস্কা–লিংকন বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্যবিজ্ঞানী হিদার হ্যালেন-অ্যাডামস মন্তব্য করেন, “এটা নিঃসন্দেহে ‘ডিজাইনার চকলেট’ তৈরি করার জন্য বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করছে।”
ফারমেন্টেশনের স্বাদ রহস্য
ফারমেন্টেশন হলো এমন এক ধাপ যা খাবার-দাবারের স্বাদকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। যেমন ওয়াইন, চিজ বা বিয়ার বানাতে খামির কিংবা বিশেষ জীবাণু যোগ করা হয়। কিন্তু চকলেট তৈরির ক্ষেত্রে কোকো বীজগুলো শুধু ফলের খোসা থেকে বের করে একত্রে রাখা হয়, স্বাভাবিকভাবেই তা ফারমেন্ট হয়ে যায়। কোনো বিশেষ জীবাণু এখানে কৃত্রিমভাবে যোগ করা হয় না। এজন্যই দীর্ঘদিন ধরে জানা যায়নি যে, কোন শর্ত বা কোন জীবাণু চকলেটের স্বাদকে প্রভাবিত করে।
গোপলচান বলেন, “আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো চকলেটের মান বাড়ানো।” এজন্য তাঁর দল কলম্বিয়ার সানতান্দের অঞ্চলের একটি খামার থেকে কোকো সংগ্রহ করে ফারমেন্টেশনের সময় pH আর তাপমাত্রার পরিবর্তন পরীক্ষা করেন। তারা অনুমান করেছিলেন, এই ভিন্নতা ব্যাকটেরিয়া আর ছত্রাকের কার্যকলাপ বদলে দিয়ে চকলেটের স্বাদে প্রভাব ফেলে।
এরপর দলটি সানতান্দের অঞ্চলের নমুনার সঙ্গে হুইলা ও আনতিওকিয়া অঞ্চলের কোকো তুলনা করে। ফারমেন্ট করা বীজ শুকানো, ভাজা ও গুঁড়া করে কোকো ‘লিকার’ তৈরি করা হয়। পেশাদার টেস্টাররা জানান, সানতান্দের ও হুইলার লিকারে পাওয়া গেছে ভাজা বাদাম, পাকা বেরি আর কফির মতো স্বাদ। তুলনায়, আনতিওকিয়ার কোকো ছিল অপেক্ষাকৃত সাদামাটা আর তেতো।
গবেষকরা দেখেছেন, তিন অঞ্চলের কোকোর জেনেটিক পটভূমি প্রায় এক, তাই স্বাদের ভিন্নতার জন্য দায়ী হলো ফারমেন্টেশনের পরিবেশ ও মাইক্রোবের পার্থক্য। উদাহরণস্বরূপ, Torulaspora ও Saccharomyces নামের ছত্রাক সূক্ষ্ম আর উন্নত মানের চকলেটের স্বাদের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত।
ডিজাইনার চকলেটের পথে
পরবর্তী ধাপে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষাগারে কৃত্রিমভাবে জীবাণুর দল তৈরি করে কোকো বীজ ফারমেন্ট করান। তৈরি হওয়া লিকার টেস্টাররা পরীক্ষা করে নিশ্চিত করেন, এগুলোতে সানতান্দের ও হুইলার মতো উন্নতমানের স্বাদ পাওয়া গেছে।
গবেষকরা বলছেন, তাদের ফলাফল প্রমাণ করছে যে, pH, তাপমাত্রা আর জীবাণুর সম্পর্কই মূলত নির্ধারণ করে কোন অঞ্চলের চকলেট কেমন স্বাদের হবে। একইসঙ্গে শিল্প পর্যায়ে চকলেট উৎপাদনে মান ও স্বাদ নিয়ন্ত্রণের নতুন পদ্ধতিরও দিকনির্দেশনা মিলছে।
বোগোটার লস আন্দেস বিশ্ববিদ্যালয়ের রাসায়নিক প্রকৌশলী আন্দ্রেস ফের্নান্দো গনসালেস বারিওসের ভাষায়, “এভাবে আমরা প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারব, নির্দিষ্ট স্বাদ তৈরি করতে পারব, মান বাড়াতে পারব, আর নির্দিষ্ট পরিবেশ বা সময়ের ওপর নির্ভর করতে হবে না।” এর ফলে কোকোর অর্থমূল্যও আরও বাড়তে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
———
A defined microbial community reproduces attributes of fine flavour chocolate fermentation. Nat Microbiol (2025).
DOI: 10.1038/s41564-025-02077-6
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


