একটি ইন্টারস্টেলার প্রোব ব্ল্যাক হোলের দিকে পাঠানো হলে, সেটি একশত বছরেরও কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছে পৃথিবীতে তথ্য পাঠাতে পারে—যদি আমরা যথেষ্ট কাছাকাছি একটি ব্ল্যাক হোল খুঁজে পাই।
চীনের সাংহাইয়ের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের কসিমো বাম্বি এমন এক অভিযানের নকশা তৈরি করেছেন, যা আগামী ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে আসা প্রযুক্তি দিয়ে সম্ভব হতে পারে।
ব্ল্যাক হোলের কাছাকাছি পৌঁছানো গেলে আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব পরীক্ষা করা যাবে এবং এক্সট্রিম মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক ধ্রুবকগুলির কী পরিবর্তন ঘটে, তা জানা সম্ভব হবে।
আমাদের থেকে বর্তমানে সবচেয়ে কাছের পরিচিত ব্ল্যাক হোলের দূরত্ব প্রায় ১৫০০ আলোকবর্ষ, এত দূরে মহাকাশযান পাঠানো বাস্তবে অসম্ভব। তবে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে গড়ে প্রতি ১০০টি নক্ষত্রের জন্য অন্তত একটি ব্ল্যাক হোল রয়েছে বলে ধারণা। অর্থাৎ আমাদের থেকে ২০–২৫ আলোকবর্ষের মধ্যেই একটি ব্ল্যাক হোল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, বলছেন বাম্বি।
তবে একে খুঁজে বের করা সহজ নয়, কারণ ব্ল্যাক হোল নিজে আলো নির্গত করে না। জ্যোতির্বিদদের এটি শনাক্ত করতে হয় কাছের নক্ষত্রের ওপর এর প্রভাব বা আলোর বিকৃতি পর্যবেক্ষণ করে।
২৫ আলোকবর্ষ দূরের ব্ল্যাক হোলে পৌঁছাতে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন দরকার হবে, তবে এটি “সম্ভবপর” বলে মনে করেন বাম্বি। এর জন্য প্রয়োজন হবে মাত্র এক গ্রাম ওজনের ন্যানোক্রাফট, যার সঙ্গে ১০ বর্গমিটার আকারের একটি লাইট সেইল থাকবে। লাইট সেল বা সোলার সেল হলো মহাকাশযান চালনার একটি পদ্ধতি, যেখানে বড় কেনো পৃষ্ঠের উপর সূর্যালোকের বিকিরণচাপ ব্যবহার করে সামনে আগায়। এই সেইলকে আলোর শক্তি দিয়ে ঠেলে তৃতীয়াংশ আলোর গতিতে চালানো যাবে, যদি একটি অতি-শক্তিশালী লেজারের সাহায্য নেওয়া হয়।
বাম্বি বলেন, “লাইট সেইল ও ন্যানোক্রাফট বর্তমানে ইন্টারস্টেলার অভিযানের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় উপায়, কারণ এগুলি আলোর গতির একটি বড় অংশে চলতে পারে।” তবে এর জন্য যে লেজার প্রয়োজন হবে, তার বর্তমান আনুমানিক খরচ প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ইউরো।
সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব পরীক্ষা করার জন্য দুটি ক্ষুদ্র প্রোব পাঠানো লাগতে পারে, অথবা প্রধান ন্যানোক্রাফট ব্ল্যাক হোলের কাছে পৌঁছে একটি দ্বিতীয় প্রোব ছেড়ে দিতে পারে। দ্বিতীয় প্রোবটি ব্ল্যাক হোলের দিকে এগোবে, আর মূল যানটি দূরে থেকে তথ্য সংগ্রহ করে পৃথিবীতে পাঠাবে।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেরেন্ট লুইস বলেন, প্রস্তাবে অসম্ভব কিছু নেই, তবে প্রতিটি ধাপই অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী। তার মতে, শতবর্ষব্যাপী এ মিশনের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, যানটি গন্তব্যে পৌঁছানোর সময় প্রযুক্তি হয়তো এত উন্নত হবে যে তখন এটি অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবে। “শত বছরের প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পরে হয়তো এমন ইঞ্জিন আবিষ্কৃত হবে, যা আমরা এখন কল্পনাও করতে পারি না।”
তিনি আরও বলেন, বাম্বির পরিকল্পনায় যানটিকে ব্ল্যাক হোলের কাছে পৌঁছে কীভাবে স্লো করা হবে, তা উল্লেখ নেই। বাম্বির মতে, স্লো করার চেষ্টা না করে প্রধান যান থেকে ছোট প্রোব ছেড়ে দেওয়াই সহজ সমাধান। এই প্রোবগুলি চলতে চলতেই তথ্য পাঠাবে, কিছু হয়তো ব্ল্যাক হোলের মধ্যেও ঢুকে যাবে, তবুও সেটি মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র পরীক্ষা করার জন্য যথেষ্ট হবে।
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যাম ব্যারন বলেন, এটি তার পড়া সবচেয়ে “কল্পনাপ্রবণ” গবেষণাপত্রগুলির একটি। তবে একশো বছর আগে যেমন লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারের ধারণা সায়েন্স ফিকশন মনে হতো, এখন সেটি বাস্তব। “অত্যন্ত ছোট কিছু ব্যবহার করাই সম্ভবত সঠিক পথ,” তিনি বলেন, “তবে প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই এমন কিছু বানাতে পারব, যা এই নকশার সব শর্ত পূরণ করবে?”
মানুষের পক্ষে সরাসরি ব্ল্যাক হোলে যাওয়া সম্ভব নয়, কারণ ১০,০০০ g ত্বরণের ধাক্কা আমাদের শরীর সহ্য করতে পারবে না। যদি না কোথাও একটি স্থান-কালের সুড়ঙ্গ (ওয়ার্মহোল) পাওয়া যায়।
বাম্বি হাস্যরসের সঙ্গে বলেন, “মানুষ নিয়ে এমন মিশন করতে হলে ‘ইন্টারস্টেলার’ মুভির মতো কাছাকাছি একটি ওয়ার্মহোল প্রয়োজন হবে। আমার প্রস্তাবে, দুর্ভাগ্যবশত, কোনো ওয়ার্মহোল নেই।”
———
An interstellar mission to test astrophysical black holes, iScience (2025).
DOI: 10.1016/j.isci.2025.113142
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


