OpenAI সম্প্রতি এমন একটি লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (Large Language Model বা LLM) উন্মোচন করেছে, যা প্রতিষ্ঠানটির নামের (“ওপেন”) সাথেই তাল মিলিয়ে চলে। ‘gpt-oss’ নামে পরিচিত এই মডেলটি হচ্ছে OpenAI-এর প্রথম যুক্তিনির্ভর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), যা ওপেন ওয়েট (open-weight)। অর্থাৎ গবেষকরা এটি ডাউনলোড করে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী কাস্টমাইজ করতে পারবেন।
ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকো-ভিত্তিক OpenAI গত ৫ আগস্ট, ২০২৫ একটি ব্লগ পোস্ট এবং কারিগরি বিবরণীতে এই মডেলটি প্রকাশ করে। অনেক কাজেই gpt-oss, OpenAI-এর সর্বাধুনিক মডেলগুলোর কাছাকাছি পারফর্ম করছে। এটি দুটি আকারে পাওয়া যাচ্ছে, যেগুলোর মধ্যে ছোটটি একটি সাধারণ ল্যাপটপে অফলাইনেই চালানো সম্ভব। ফলে এই মডেল সংবেদনশীল ডেটা বিশ্লেষণ বা প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা যাবে, যা ক্লাউডে পাঠানো সম্ভব নয়।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ ও কম্পিউটার বিজ্ঞানী সায়মন ফ্রিডার বলেন, “আমি অত্যন্ত রোমাঞ্চিত। ওপেন-সোর্স LLM-এর প্রতিযোগিতা ইতিমধ্যেই তীব্র, আর এটি সেই প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করে তুলবে, যা পুরো গবেষণা কমিউনিটির জন্যই সুফল বয়ে আনবে।”
চীনা কোম্পানি যেমন হাংঝু-ভিত্তিক DeepSeek এবং বেইজিং-ভিত্তিক Moonshot AI-এর তৈরি শক্তিশালী ওপেন-ওয়েট মডেলগুলো বর্তমানে গবেষকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। Nathan Lambert নামের এক গবেষকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী (যেটি gpt-oss প্রকাশের আগেই সম্পন্ন হয়েছিল), চীনা মডেলগুলো ইতোমধ্যেই ওপেন সোর্স মার্কিন মডেল যেমন Meta-এর Llama-কে ছাড়িয়ে পারফর্ম করছে এবং শিগগিরই ডাউনলোড সংখ্যায়ও এগিয়ে যাবে।
গত মাসে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন তাদের AI Action Plan-এ ওপেন-ওয়েট মডেলকে “একাডেমিক গবেষণার জন্য অপরিহার্য” বলে উল্লেখ করে। OpenAI-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা গ্রেগ ব্রকম্যান জানান, gpt-oss প্রকাশের সিদ্ধান্ত অনেক আগে থেকেই চলছিল, এবং এটি চীনা মডেলগুলোর সাফল্যের প্রতিক্রিয়া নয়। “আমরা কখনোই এমনটা ভাবিনি যে, আমরা এটি করব না,” বলেন তিনি।
সব মডেলেই কোনো না কোনো পক্ষপাত (bias) থাকে, তাই বিভিন্ন উৎস থেকে মডেল আসা ব্যবহারকারীদের জন্য ভালো, বলেন ফ্রিডার। “পশ্চিমা বিশ্বের একটি শীর্ষস্থানীয় ওপেন-ওয়েট মডেল আসা মানে হচ্ছে, যেসব কোম্পানি এই জায়গায় নেতৃত্ব দিচ্ছে, সেখানে ভারসাম্য তৈরি হওয়া।”
গণিতে পারদর্শী
এখন পর্যন্ত OpenAI প্রধানত নিজেদের মডেল প্রাইভেট রেখেছে, ব্যতিক্রম ছিল ২০১৯ সালের GPT-2 যেটা ওপের সোর্স। আর এই নতুন gpt-oss মডেলগুলোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এগুলো যুক্তিনির্ভর বা ‘reasoning’-এর উপর ভিত্তি করে কাজ করে, ধাপে ধাপে চিন্তা প্রক্রিয়া অনুকরণ করে ফলাফল দেয়। যা জিপিটি-২ এ নেই।
এর আগে প্রকাশিত যুক্তিনির্ভর মডেল যেমন OpenAI-এর o3, বিজ্ঞান ও গণিত সমস্যায় দারুণ পারফর্ম করেছে। বর্তমানে গবেষকেরা এসব মডেল ব্যবহার করছেন কোড লেখার, গবেষণা পত্র পর্যালোচনার এবং এমনকি AI ‘co-scientists’ হিসেবেও, যাতে গবেষণার গতি বাড়ানো যায়।
gpt-oss মডেলগুলো টেক্সট-ভিত্তিক হলেও (মানে ছবি বা ভিডিও বিশ্লেষণ করতে পারে না), অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানটির সর্বাধুনিক পেইড মডেলগুলোর কাছাকাছি পারফর্ম করে। এটি ওয়েব ব্রাউজ করতে, কোড চালাতে এবং সফটওয়্যার পরিচালনা করতে পারে। OpenAI-এর দাবি, যুক্তিনির্ভর কাজে gpt-oss একই আকারের অন্যান্য ওপেন মডেলের চেয়ে ভালো করে।
AIME 2025 নামক একটি চ্যালেঞ্জিং গণিত ভিত্তিক বেঞ্চমার্কে, gpt-oss DeepSeek-এর R1-এর চেয়ে ভালো স্কোর করেছে। আবার Humanity’s Last Exam নামের ৩,০০০ প্রশ্নের একটি টেস্টেও এর একটি সংস্করণ শীর্ষ ওপেন মডেলগুলোর সাথে পাল্লা দিয়েছে।
(প্রায়) পুরোপুরি ওপেনসোর্স নয়
OpenAI-এর প্রধান বিজ্ঞানী জাকুব পাচকি সম্প্রতি জানিয়েছেন, নিরাপত্তার কারণে প্রতিষ্ঠানটি তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী মডেলগুলো সম্পূর্ণ ওপেন-ওয়েট আকারে প্রকাশ করবে না। কারণ, একবার প্রকাশ করে দিলে এর ব্যবহার বা উন্নয়নের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব নয়।
তবে ৫ আগস্ট, ২০২৫ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে OpenAI জানায়, gpt-oss মডেলকে যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিকর কাজে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তবুও এটি জৈব নিরাপত্তা বা সাইবার নিরাপত্তার মতো ঝুঁকির ক্ষেত্রে বিদ্যমান অন্যান্য ওপেন বা বেসরকারি মডেলগুলোর চেয়ে বেশি হুমকি সৃষ্টি করে না।
যদিও gpt-oss ওপেন-ওয়েট (open-weight) হলেও পুরোপুরি ওপেন-সোর্স নয়, যেমন এর ট্রেইনিং ডেটার বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে না। ফলে গবেষকেরা এটিকে হুবহু পুনর্নির্মাণ করতে পারবেন না।
ওপেন-ওয়েট মডেল পার্সোনালাইজেশনের জন্য অনেক বেশি সম্ভাবনাময়, বলেন সিয়াটলের ফ্রেড হাচিনসন ক্যান্সার সেন্টারের তথ্যবিজ্ঞানী ক্যারি রাইট।
তবে রাইট এটাও বলেন, গবেষকেরা বহুদিন ধরেই OpenAI-এর বাইরের বিভিন্ন টুল ব্যবহার করে আসছেন। এমনকি OpenAI-এর নিজস্ব বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, নতুন মডেলগুলো অনেক সময় আগের তুলনায় বেশি ‘hallucination’ বা তথ্য উদ্ভাবনের প্রবণতা দেখায়।
ফ্রেড হাচিনসনেরই আরেকজন তথ্যবিজ্ঞানী এলিজাবেথ হামফ্রিস বলেন, “এই মডেলগুলোর আউটপুট এখনো যাচাই করার প্রয়োজন হয়। এগুলো আমাদের কাজকে সহায়তা করতে পারেও পুরোপুরি প্রতিস্থাপনযোগ্য নয় এবং সেটাই বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি।”
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


