২০২০ সালে, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পৃথিবী থেকে ৮১ আলোকবর্ষ দূরের এক তারার চারপাশে আবর্তনরত WD 1856+534 b নামের একটি গ্যাস জায়ান্ট গ্রহ শনাক্ত করেন। বৃহস্পতির চেয়ে প্রায় ছয়গুণ বেশি ভরের এই এক্সোপ্ল্যানেটটিকে “সুপার-জুপিটার” বলা হয়। এটি ছিল প্রথম আবিষ্কৃত গ্রহ, যা একটি সাদা বামন (White Dwarf বা WD) নক্ষত্রের চারপাশে প্রদক্ষিণ করে। সম্প্রতি প্রি-প্রিন্ট সার্ভারে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে, একটি আন্তর্জাতিক গবেষক দল জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের (JWST) মিড-ইনফ্রারেড ইন্সট্রুমেন্ট (MIRI) ব্যবহার করে এই গ্রহটির পর্যবেক্ষণের বিবরণ দিয়েছে। তাদের গবেষণা নিশ্চিত করেছে, WD 1856+534 b এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে ঠান্ডা এক্সোপ্ল্যানেট।
এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান, অ্যান আরবর-এর জ্যোতির্বিদ্যা বিভাগের সহকারী গবেষক বিজ্ঞানী মেরি অ্যান লিমব্যাক। তার সঙ্গে আরও যুক্ত ছিলেন এমআইটির কাভলি ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স অ্যান্ড স্পেস রিসার্চ, জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স ল্যাব, ইউনিভার্সিটি অব ভিক্টোরিয়া, ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিন, সিআইইআরএ (Center for Interdisciplinary Research and Exploration in Astrophysics), সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স, ইউনিভার্সিটি অব সাউথার্ন কুইন্সল্যান্ড এবং NSF NOIRLab ও জেমিনি অবজারভেটরির গবেষকরা।
তাদের পর্যবেক্ষণ ছিল জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের Cycle 3 General Observation (GO) প্রোগ্রামের অংশ। এই প্রোগ্রামের উদ্দেশ্য ছিল ওয়েবের উন্নত ইনফ্রারেড অপটিক্স এবং স্পেকট্রোমিটার ব্যবহার করে সরাসরি গ্রহটির বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করা। এই পদ্ধতিতে এক্সোপ্ল্যানেটের পৃষ্ঠ বা বায়ুমণ্ডল থেকে প্রতিফলিত আলো সংগ্রহ করে স্পেকট্রোমিটার দিয়ে তার রাসায়নিক স্বাক্ষর বিশ্লেষণ করা হয়।
ক্রেডিট: Mary Anne Limbach at el.
এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা সম্ভাব্য জীবনের চিহ্ন (অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, মিথেন, পানি ইত্যাদি) শনাক্ত করতে পারেন এবং গ্রহের গঠন ও উৎপত্তি সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারেন। JWST-এর মতো উন্নত প্রযুক্তির টেলিস্কোপ ব্যবহার করে, এই পদ্ধতিতে সৌরজগতের বাইরের প্রাণের সম্ভাব্য প্রথম নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে। গ্রহের নির্গত আলো (emission spectra) বিশ্লেষণ করেও গ্রহের গঠন ও ভ্রাম্যমাণ ইতিহাস জানা সম্ভব হয়। তবে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, এক্সোপ্ল্যানেট থেকে সরাসরি আলো শনাক্ত করা এখনো কঠিন কাজ, কারণ তাদের নক্ষত্রের আলো এতই তীব্র যে তা গ্রহের আলোকে ঢেকে দেয়।
ফলে, সরাসরি ইমেজিং মূলত বিশাল আকারের গ্রহ (যেমন গ্যাস জায়ান্ট) এবং প্রশস্ত কক্ষপথে থাকা বা অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রার বায়ুমণ্ডলবিশিষ্ট গ্রহগুলোর ক্ষেত্রেই সীমিত ছিল। এখনো পর্যন্ত কোনো পাথুরে (পৃথিবীর মতো) গ্রহকে নক্ষত্রের কাছাকাছি কক্ষপথে সরাসরি ইমেজিংয়ের মাধ্যমে দেখা যায়নি। একইসঙ্গে, পৃথিবীর মতো শীতল (১.৮৫°সে) গ্রহের নির্গত আলোও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে সাদা বামন নক্ষত্রগুলো এমন ঠান্ডা গ্রহ শনাক্ত ও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে বেশ সুযোগ দেয়।
তাছাড়া, সাদা বামন নক্ষত্রের চারপাশে গ্রহ থাকা মানে তারা নক্ষত্রের পরিণত জীবনধারার মধ্যেও টিকে থাকতে পারে কি না এবং সেখানে বসবাসযোগ্য পরিবেশ টিকে থাকার সম্ভাবনা আছে কি না, এসব বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ওয়েবের ক্ষমতা ব্যবহার করে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছেন। এই গবেষণায়, লিমব্যাক ও তার সহকর্মীরা JWST-এর MIRI ডেটা ব্যবহার করে ইনফ্রারেড এক্সেস (IR excess) পদ্ধতিতে WD 1856+534 b গ্রহের উপস্থিতি নিশ্চিত করেন।
এই পদ্ধতিতে তারা গ্রহটির ভর নির্ধারণ এবং তার বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা পরিমাপ করতে সক্ষম হন। বিশ্লেষণে দেখা যায়, গ্রহটির গড় তাপমাত্রা ১৮৬ কেলভিন (-৮৭°সে), যা এটিকে এখন পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া সবচেয়ে ঠান্ডা এক্সোপ্ল্যানেট হিসেবে নিশ্চিত করে। পাশাপাশি, তারা নিশ্চিত করেন যে গ্রহটির ভর বৃহস্পতির ভরের ছয়গুণের বেশি নয়, যেখানে পূর্ববর্তী পর্যবেক্ষণে এর ভর ১৩.৮ বৃহস্পতি ভর হিসেবে অনুমান করা হয়েছিল। তাদের এই ফলাফল প্রথমবারের মতো সরাসরি প্রমাণ দিল যে, গ্রহরা সাদা বামন নক্ষত্রের চারপাশের হ্যাবিবিটেবল জোনের নিকটবর্তী কক্ষপথেও টিকে থাকতে পারে।
গবেষক দল ২০২৫ সালে নির্ধারিত WD 1856 b-এর আরও বিস্তারিত পর্যবেক্ষণের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। আশা করা হচ্ছে, তখন হয়তো নতুন গ্রহেরও সন্ধান মিলবে, যা জানাবে WD 1856 b কীভাবে তার বর্তমান কক্ষপথে পৌঁছেছে। এছাড়া, JWST-এর Cycle 1 এ Near-Infrared Spectrometer (NIRSpec) ব্যবহার করে করা পর্যবেক্ষণের ফলাফলও শিগগির প্রকাশিত হবে, যা গ্রহটির বায়ুমণ্ডলের প্রাথমিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরবে।
———
Thermal Emission and Confirmation of the Frigid White Dwarf Exoplanet WD 1856+534b, arXiv:2504.16982 [astro-ph.EP]
DOI: 10.48550/arXiv.2504.16982
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



