বেশ কয়েক মাস আগে, সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা জাদুঘরে পোকামাকড়বিদ অ্যান্ডারসন লেপেকো জীবাশ্মের সংগ্রহ ঘাঁটছিলেন, তখন একটি অদ্ভুত নমুনা তার চোখে পড়ে। নমুনাটি ছিলো চুনাপাথরে আটকে থাকা জীবাশ্ম। আর চুনাপাথরের ভেতর আটকে থাকা সেই জীবাশ্মটি ছিল একটি প্রাচীন পিঁপড়ার, আকারে প্রায় একটি পেনি কয়েনের মতো, যার ছিল কাস্তের মতো বাঁকা চোয়াল। এই প্রাণীটি তার পূর্বপরিচিত বিস্তৃতি এলাকা (উত্তর গোলার্ধ) থেকে অনেক দূরে আবিষ্কৃত হয়েছিল, এবং এর বয়স ছিল ১১.৩ কোটি বছর, যা একে আজ পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন পিঁপড়া করে তুলেছে।
Current Biology জার্নালে প্রকাশিত এই আবিষ্কারটির রিপোর্ট পিঁপড়ার উৎপত্তি ও বিবর্তন সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের পূর্বের ধারণা পাল্টে দিতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন নিউ জার্সি ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির (New Jersey Institute of Technology) বিবর্তনবিদ ফিল বার্ডেন (তিনি এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না)। তিনি বলেন, শুধু এই বিরল পোকাটিকে খুঁজে পাওয়াই রোমাঞ্চকর ও বিস্ময়কর নয়, বরং দক্ষিণ আমেরিকায় এটি পাওয়া আরও অবাক করা বিষয়, যেখানে এতদিন খুব কম জীবাশ্মই উদ্ধার হয়েছে। বার্ডেন জানান, দক্ষিণ আমেরিকা বহুদিন ধরেই পিঁপড়ার বিবর্তনের ইতিহাসে এক বিশাল ‘অন্ধকার বাক্স’ ছিল — অর্থাৎ সেখানে কী ঘটেছিল তা প্রায় অজানাই ছিল।
ক্রেডিট: Anderson Lepeco
পিঁপড়ার উৎপত্তি হয়েছিল জুরাসিক যুগের শেষভাগ ও ক্রিটেশিয়াস যুগের শুরুতে, আনুমানিক ১৬.৮ থেকে ১২ কোটি বছর আগে, যখন তারা বোলতা ও মৌমাছি থেকে পৃথক হয়। তখন পৃথিবীতে ডাইনোসররা রাজত্ব করত। এদিকে সেসময়েই পিঁপড়ারা ছড়িয়ে পড়া ও বৈচিত্র্য লাভ শুরু করে দিয়েছিল, যার মধ্যে আধুনিক পিঁপড়ের পূর্বপুরুষও ছিল। কিন্তু, জীবাশ্মের অভাবে বিজ্ঞানীরা সেই ইতিহাসের অনেক খুঁটিনাটি পূরণ করতে পারেননি।
নতুন এই জীবাশ্ম সে ঘাটতি কিছুটা পূরণ করতে সহায়তা করবে। ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ক্রাটো ফরমেশন (Crato Formation) থেকে উদ্ধার করা এই নমুনাটি ফ্রান্স, মিয়ানমার ও কানাডার অ্যাম্বারে পাওয়া হেল পিঁপড়া (Hell Ant)-এর তুলনায় ১.৩ কোটি বছর পুরনো। বার্ডেন জানান, এই জীবাশ্মটি একটি বিলুপ্ত পিঁপড়ে গোষ্ঠীর সদস্য, যারা আধুনিক পিঁপড়ার ‘কাজিন’ বা নিকটাত্মীয়।
এটি যে একটি হেল পিঁপড়া, তা নিশ্চিত। লেপেকো এবং তার সহকর্মীরা মাইক্রো-কম্পিউটেড টোমোগ্রাফি (micro–CT) নামের একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করে চুনাপাথরের ভিতরে থাকা জীবাশ্মটির ভিতরের গঠন বিশ্লেষণ করেন, এবং একটি বিশদ থ্রিডি (3D) চিত্র তৈরি করেন। এতে দেখা যায়, এই পিঁপড়ের ছিল শিংয়ের মতো গঠন ও কাস্তের মতো চোয়াল — যা আধুনিক পিঁপড়েদের মধ্যে দেখা যায় না। এই অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো দিয়ে তারা তাদের শিকারকে গেঁথে ফেলতে পারত। গবেষকরা এই নতুন হেল পিঁপড়াকে নতুন একটি প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং এর নাম দিয়েছেন Vulcanidris cratensis. নামটি সেই ভলকানো পরিবারকে সম্মান জানিয়ে রাখা হয়েছে, যারা এই জীবাশ্মটি জাদুঘরে দান করেছিল।
ক্রেডিট: Odair M. Meira
এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে পিঁপড়েরা পূর্বের ধারণার চেয়ে আরও আগে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়া হয়ে শুরু করে দিয়েছিলো এবং হেল পিঁপড়ারা সম্ভবত পিঁপড়া ও তাদের বোলতা পূর্বপুরুষদের মধ্যে এক ধরনের সংযোগ ছিল। Fossil-এর তথ্য অনুযায়ী, হেল পিঁপড়ারা সম্ভবত ছিল পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ও নতুন প্রজাতি গঠনের প্রথম বড় গোষ্ঠী। যেহেতু এই নতুন ব্রাজিলিয়ান জীবাশ্ম উত্তর গোলার্ধে পাওয়া হেল পিঁপড়াদের তুলনায় ১.৩ কোটি বছর পুরনো, গবেষকরা মনে করছেন দক্ষিণ আমেরিকাই ছিল হেল পিঁপড়েদের বিবর্তনের কেন্দ্র।
করনেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (Cornell University) পোকামাকড়বিদ ও বিবর্তনবিদ কোরি মোরো (গবেষণায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন না) বলেন, দক্ষিণ আমেরিকায় নতুন আরেকটি হেল পিঁপড়া যুক্ত হওয়ায় এখন বিজ্ঞানীরা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারছেন, সেই সময়ে কত প্রজাতির পিঁপড়া ছিল এবং তারা কীভাবে বিবর্তিত হয়েছিল। তার ভাষায়, “একটি মাত্র জীবাশ্ম পুরো একটি প্রাণী গোষ্ঠীর ইতিহাসের ধারণাকে নতুন করে সাজিয়ে দিতে পারে। এটা সত্যিই অভূতপূর্ব।”
তবে জীবাশ্মটি পিঁপড়ার বিবর্তন সম্পর্কে অনেক নতুন তথ্য দিলেও একটি প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে: এত অদ্ভুত শিকারের কৌশল থাকা সত্ত্বেও হেল পিঁপড়ারা কেন বিলুপ্ত হয়ে গেল, যখন অন্য অনেক লাইনেজ টিকে রইল?
———
A hell ant from the Lower Cretaceous of Brazil. Current Biology (2025)
DOI: 10.1016/j.cub.2025.03.023
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।




