মানব জিনোমে প্রায় ২০ হাজার জিন রয়েছে, যেগুলো কাজ করতে সক্ষম প্রোটিন তৈরির নির্দেশ বহন করে বলে বর্তমান ধারণা। কিন্তু কিছু বিজ্ঞানীর মতে, এর বাইরে আরও হাজার হাজার রহস্যময় “ডার্ক প্রোটিন” থাকতে পারে, যাদের ভূমিকা এখনো অজানা হলেও কোষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এই প্রোটিনগুলো এবং যেসব জিন এগুলো তৈরি করে, সেগুলো এতদিন পরিচিত মানব জিন ও প্রোটিনের ডেটাবেসের বাইরে ছিল।
৬ মে ২০২৬ Nature জার্নালে ঘোষিত একটি নতুন উদ্যোগ মানব জিনোমে থাকা এই হাজার হাজার অণুকে একটি নতুন নাম দিয়েছে, পেপটাইডিন (peptidein)। একই সঙ্গে এগুলোকে জীববিজ্ঞান গবেষণায় ব্যবহৃত বড় বড় জিন ও প্রোটিন ডেটাবেসেও অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
গবেষকদের মতে, এই নতুন নামকরণ বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এবং কোষে পেপটাইডিনের কাজ বোঝার জন্য নতুন গবেষণার পথ খুলে দেবে। ইতিমধ্যে কিছু পেপটাইডিনের সঙ্গে শিশুদের ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগ এবং কোষের মৌলিক কার্যক্রমের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে অধিকাংশ পেপটাইডিনের কাজ এখনো অজানা। কিছু প্রমাণ বলছে, এদের অনেকগুলো হয়তো কোষে প্রোটিন তৈরির সময় তৈরি হওয়া পার্শ্বপণ্য, যাদের নির্দিষ্ট কোনো কাজ নেই।
জার্মানির University of Heidelberg-এর বায়োইনফরমেটিশিয়ান Christoph Dietrich বলেন, “এটি একটি বড় অগ্রগতি। এই মাইক্রোপ্রোটিনগুলো গবেষণার সম্পূর্ণ নতুন এক ঢেউ তৈরি করার সম্ভাবনা রাখে।”
ছোট, রহস্যময় প্রোটিন
ডার্ক প্রোটিন সাধারণত অ্যামিনো অ্যাসিডের দিক থেকে খুব ছোট হয় এবং অন্যান্য জীবের মধ্যে এদের কোনো বিবর্তনগত ট্রেইল খুঁজে পাওয়া যায় না। এ কারণেই এতদিন এগুলো প্রোটিন-কোডিং জিন ও প্রোটিওম ডেটাবেজ থেকে বাদ পড়েছিল।
অনেক ক্ষেত্রে, যেসব জিন এই প্রোটিন তৈরি করে, সেগুলো পরিচিত প্রোটিন-কোডিং জিনের খুব কাছাকাছি থাকে। কখনো কখনো একই অংশের ওপরও অবস্থান করে।
নতুন গবেষণাপত্রে “ট্রান্সকোড কনসোর্টিয়াম” নামে একটি উদ্যোগ হাজার হাজার সম্ভাব্য ডার্ক প্রোটিন নিয়ে পরীক্ষামূলক তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। তারা প্রথমে ৭,২৬৪টি ডিএনএ সিকোয়েন্সের তালিকা তৈরি করে, যেগুলো ডার্ক প্রোটিন তৈরি করতে পারে বলে সন্দেহ ছিল।
বিশ্লেষণের পর দেখা যায়, মাত্র ১৫টির ক্ষেত্রে এত শক্তিশালী পরীক্ষামূলক প্রমাণ পাওয়া গেছে যে সেগুলোকে আনুষ্ঠানিক প্রোটিন-কোডিং জিনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার কথা ভাবা হচ্ছে।
আরও হাজার হাজার অণুর অংশ কোষে শনাক্ত করা গেলেও তাদের প্রমাণ তুলনামূলক দুর্বল ছিল এবং তাদের কাজ প্রায় পুরোপুরি অজানা।
এই অণুগুলোর নামকরণের জন্য গবেষকেরা “পেপটাইড” এবং “প্রোটিন” শব্দ মিলিয়ে “পেপটাইডিন” নামটি তৈরি করেন।
যুক্তরাজ্যের হিনক্সটনে অবস্থিত European Bioinformatics Institute-এর GENCODE ডেটাবেসে কাজ করা বায়োইনফরমেটিশিয়ান Jonathan Mudge বলেন, “এগুলো অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে তৈরি, কিন্তু এরা কী কাজ করে তা আমরা জানি না। এমনও হতে পারে যে এরা কোনো কাজই করে না। কিন্তু আমরা অন্তত জানি, এদের অস্তিত্ব আছে।”
জীববিজ্ঞানের ‘বামন গ্রহ’
GENCODE এবং অন্যান্য ডেটাবেস এখন পেপটাইডিনের জন্য আলাদা একটি শ্রেণি তৈরি করছে। মাডজের মতে, এর ফলে অন্যান্য বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকর্ষিত হবে এবং এদের কাজ বোঝার গবেষণা ত্বরান্বিত হবে। তিনি বলেন, “এক অর্থে আমরা বলছি, আপনারা এগিয়ে যান এবং আমাদের জানান এগুলো কী করে।”
মাডজের তথ্য অনুযায়ী, আগে যেসব সিকোয়েন্সকে ডার্ক প্রোটিন তৈরির উৎস মনে করা হতো, তার মধ্যে প্রায় দশটিকে ইতিমধ্যে GENCODE-এর আনুষ্ঠানিক প্রোটিন-কোডিং জিন তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও প্রমাণ পাওয়া গেলে আরও অনেক পেপটাইডিন সেই তালিকায় যোগ হবে বলে তিনি আশা করছেন।
তার মতে, বর্তমানে “ক্যানোনিক্যাল” বা স্বীকৃত কিছু প্রোটিনকেও ভবিষ্যতে পেপটাইডিন হিসেবে পুনর্বিন্যাস করা হতে পারে। তিনি এর তুলনা করেন জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি ঘটনার সঙ্গে, যখন সৌরজগতের হাজার হাজার বামন গ্রহ আবিষ্কারের পর প্লুটোকে আর পূর্ণাঙ্গ গ্রহ হিসেবে গণ্য করা হয়নি। মাডজ বলেন, “আমরা এটাকে প্রায় প্লুটো মুহূর্ত হিসেবে দেখছি।”
নিউইয়র্কের Columbia University-এর মলিকুলার বায়োলজিস্ট Xuebing Wu বলেন, তিনি “পেপটাইডিন” ধারণাটি পছন্দ করেছেন এবং নামটিও গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে।
তার ভাষায়, “এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গবেষণা। এই নতুন ধরনের জিন নিয়ে ভবিষ্যৎ কার্যকরী গবেষণার ভিত্তি তৈরি করে দিচ্ছে।”
তবে উ মনে করেন, আরও গভীর গবেষণায় দেখা যাবে কিছু পেপটাইডিন কোষের প্রোটিন তৈরির যন্ত্রের পার্শ্বপণ্য মাত্র, স্বাধীনভাবে কাজ করা কোনো উপাদান নয়। তার গবেষণা দল দেখেছে, এদের অনেকগুলো খুব দ্রুত ভেঙে যায়।
সাম্প্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা অন্তত ৫০টির বেশি পেপটাইডিনের ক্ষেত্রে এমন ইঙ্গিত পেয়েছেন যে এগুলো কোনো না কোনোভাবে কোষের জন্য অপরিহার্য।
আগের গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে পেপটাইডিন নামে পরিচিত এই অণুগুলো কিছু ক্যান্সারের গুরুত্বপূর্ণ চালক হতে পারে। এর মধ্যে শিশুদের আক্রমণাত্মক মস্তিষ্ক ক্যান্সারও রয়েছে। এছাড়া হৃদযন্ত্রের কার্যক্রমেও এদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে।
নেদারল্যান্ডসের উটরেখটে অবস্থিত Princess Máxima Center for Pediatric Oncology-এর সিস্টেমস বায়োলজিস্ট এবং কনসোর্টিয়ামের সহনেতা Sebastiaan van Heesch মনে করেন, ভবিষ্যতে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসবে।
তিনি বলেন, “এখন আর কেউ চোখ বন্ধ করে থাকতে পারবে না।”
———
Expanding the human proteome with microproteins and peptideins. Nature (2026).
DOI: 10.1038/s41586-026-10459-x
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


