একজন গুরুতর বাক্-অক্ষম ব্যক্তি এখন কথা বলতে পারছেন, এমনকি গানও গাইতে পারছেন একটি মস্তিষ্কে বসানো ইমপ্লান্টের সাহায্যে, যা তার স্নায়ুতে সৃষ্ট সংকেতগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে ভাষায় রূপান্তর করছে। এই ডিভাইসটি তার কথার স্বরে ওঠানামা, জোর দিয়ে বলা শব্দ এবং তিনটি ভিন্ন স্বরে সুর তুলে গুনগুন করাও প্রকাশ করতে পারে।
এই প্রযুক্তিকে বলা হয় ব্রেইন–কম্পিউটার ইন্টারফেস (BCI)। এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে অংশগ্রহণকারীর মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক সংকেত বিশ্লেষণ করে যখন তিনি কথা বলার চেষ্টা করেন। এটি প্রথম ডিভাইস যা শুধু কথাই নয়, বরং স্বাভাবিক বাক্যের স্বর, পিচ এবং জোরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যও পুনর্গঠন করতে পারে—যেগুলো কথার টোন এবং আবেগ প্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একটি গবেষণায় দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীর কণ্ঠ অনুকরণ করে তৈরি করা কৃত্রিম কণ্ঠ তার কথা বলার ইচ্ছার সংকেত পাওয়ার মাত্র ১০ মিলিসেকেন্ডের মধ্যেই শব্দ উচ্চারণ করে ফেলেছে। Nature জার্নালে প্রকাশিত এই সিস্টেমটি পূর্ববর্তী প্রযুক্তিগুলোর তুলনায় অনেক বেশি উন্নত। আগের প্রযুক্তি সম্পূর্ণ বাক্য ঠোঁট নাড়ানোর ৩ সেকেন্ডে পর কথা বা শব্দ তৈরি করত, সেখানে এটি তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট শব্দ তৈরি করতে পারে।
রিয়েল-টাইম ডিকোডার
৪৫ বছর বয়সী এই অংশগ্রহণকারী অ্যামিওট্রফিক ল্যাটেরাল স্ক্লেরোসিস (ALS) রোগে আক্রান্ত হয়ে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলেন। এটি একটি মোটর নিউরন রোগ, যা মাংসপেশির নড়াচড়ার জন্য দায়ী স্নায়ুগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। তিনি শব্দ করতে ও ঠোঁট নাড়াতে পারতেন ঠিকই, কিন্তু তার কথা ছিল ধীরগতির ও অস্পষ্ট।
রোগের পাঁচ বছর পর তার মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ২৫৬টি সিলিকন ইলেকট্রোড বসানো হয়, প্রতিটির দৈর্ঘ্য ১.৫ মিলিমিটার। এই ইলেকট্রোডগুলো মস্তিষ্কের এমন একটি অঞ্চলে বসানো হয় যা শারীরিক নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে। গবেষক মৈত্রেয়ী ওয়াইরাগকর ও তার দল এক ডিপ-লার্নিং অ্যালগরিদম তৈরি করেন যা প্রতি ১০ মিলিসেকেন্ডে মস্তিষ্কের সংকেত বিশ্লেষণ করে অংশগ্রহণকারীর উচ্চারণের চেষ্টা করা শব্দগুলো রিয়েল-টাইমে ডিকোড করতে পারে। তারা সরাসরি শব্দ শনাক্ত করেন, কোনো নির্দিষ্ট শব্দ বা ধ্বনির ইউনিট (ফোনিম) নয়।
ওয়াইরাগকর বলেন, “মানুষ সব সময় শব্দ ব্যবহার করে মনের ভাব প্রকাশ করে না। কখনো ‘আহ’, ‘উঁহ’, ‘হুম’ জাতীয় আন্তঃক্ষেপণ বা শব্দহীন আবেগপূর্ণ আওয়াজ দিয়েও যোগাযোগ করে। তাই আমরা এমন একটি পদ্ধতি বেছে নিয়েছি যা কোনো শব্দভাণ্ডারে সীমাবদ্ধ নয়।”
তাদের AI অ্যালগরিদম প্রশিক্ষণের জন্য রোগীর অসুস্থ হওয়ার আগের সাক্ষাৎকারের রেকর্ড ব্যবহার করে তার কণ্ঠের মতো একটি কৃত্রিম কণ্ঠ তৈরি করা হয়।
গবেষকরা অংশগ্রহণকারীকে অনুরোধ করেন ‘আহ’, ‘উঁহ’ ও ‘হুম’ জাতীয় ধ্বনি এবং কিছু বানানো শব্দ বলার জন্য। এইসব ধ্বনি BCI সফলভাবে তৈরি করতে পেরেছে, যা প্রমাণ করে যে এটি নির্দিষ্ট শব্দভাণ্ডার ছাড়াও কাজ করতে সক্ষম।
বাক-স্বাধীনতা ফেরা
ডিভাইসটি ব্যবহার করে অংশগ্রহণকারী শব্দ বানাতে, খোলামেলা প্রশ্নের উত্তর দিতে এবং নিজের ইচ্ছামতো কথা বলতে পারছেন। ডিকোডারটি এমন কিছু শব্দও উচ্চারণ করতে পারছে যা ডিকোডার নিজে আগে শেখেনি। তিনি গবেষকদের বলেন, কৃত্রিম কণ্ঠে নিজের কথা শুনে তিনি “খুশি” এবং এটি “নিজের আসল কণ্ঠ” বলেই মনে হয়েছে।
আরেকটি পরীক্ষায় দেখা যায়, ডিভাইসটি বুঝতে পেরেছে তিনি কোনো বাক্য প্রশ্ন হিসেবে বলছেন, না কি সাধারণ বক্তব্য হিসেবে। এটি একই বাক্যে কোন শব্দে তিনি জোর দিচ্ছেন, তাও শনাক্ত করে কণ্ঠের স্বরসঙ্গত পরিবর্তন করতে পেরেছে। ওয়াইরাগকর বলেন, “মানব কণ্ঠের এইসব গুরুত্বপূর্ণ দিক আমরা এখানে এনেছি।” আগের প্রযুক্তি কেবল একঘেয়ে, ম্লান কণ্ঠই তৈরি করতে পারত।
জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোইঞ্জিনিয়ার সিলভিয়া মারচেসোত্তি বলেন, “এটি প্রযুক্তিতে এক নতুন ধারা। ভবিষ্যতে রোগীদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার উপযোগী একটি বাস্তব টুলে রূপ নিতে পারবে এই সিস্টেম।”
———
An instantaneous voice-synthesis neuroprosthesis. Nature (2025).
DOI: 10.1038/s41586-025-09127-3
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


