ইন্টারনেটের যেমন গুগল আছে, এখন জীববিজ্ঞানেরও আছে মেটাগ্রাফ (MetaGraph)। Nature জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, এই সার্চ ইঞ্জিনটি এখন পাবলিক ডেটাবেজে সংরক্ষিত বিপুল জৈবিক তথ্য দ্রুত খুঁজে বের করতে পারে।
“এটা সত্যিই এক বিশাল অর্জন,” বলছেন প্যারিসের পাস্তুর ইনস্টিটিউটের বায়োকম্পিউটিং গবেষক রায়ান চিকি। “তারা র জৈব তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে।” এই ডেটাগুলির মধ্যে রয়েছে ডিএনএ, আরএনএ ও প্রোটিন সিকোয়েন্স যার পরিমাণ লাখ লাখ কোটি ডিএনএ অক্ষরের সমান। অর্থাৎ ‘পেটাবেস’ পরিমাণ তথ্য। এই তথ্য গুগলের ওয়েবপেজের বিশাল ইনডেক্স থেকেও বড়।
MetaGraph-কে “ডিএনএ-র গুগল” বলা হলেও চিকির মতে এটি বরং ইউটিউবের সার্চ ইঞ্জিনের মতো। যেমন ইউটিউব এমন ভিডিওও খুঁজে বের করতে পারে যেখানে “লাল বেলুন” শব্দটি টাইটেল বা ডেসক্রিপশনে না থাকলেও ভিডিওতে আছে, তেমনি মেটাগ্রাফও বিশাল জিনগত ডেটাসেটের গভীরে লুকিয়ে থাকা প্যাটার্ন শনাক্ত করতে পারে সেগুলো আগে থেকে ট্যাগ করা না থাকলেও।
“এটি এমন কাজ সম্ভব করছে, যা অন্য কোনোভাবে করা যায় না,” বলেন চিকি।
MetaGraph তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিল জিনোম সিকোয়েন্সিং ডেটার বিশালতা ও অপ্রবেশযোগ্যতা মোকাবিলা করা। গত কয়েক দশকে এসব ডেটাবেসের আকার দ্রুত বেড়েছে, কিন্তু সেই বিপুল তথ্য ব্যবহার করাই হয়ে উঠেছে বিজ্ঞানীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ র সিকোয়েন্স ডেটা ফ্র্যাগমেন্টেড, নোয়েজি আর সার্চ করার মতো না। “এই বিপুল তথ্যই আসলে ব্যবহার বাধাগ্রস্ত করছে,” বলেন কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটেশনাল বায়োলজিস্ট আরতেম বাবায়ান।
গবেষণার সহলেখক সুইজারল্যান্ডের ETH Zurich-এর বায়োইনফরম্যাটিশিয়ান আন্দ্রে কাহলেস জানান, মেটাগ্রাফের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এখন Sequence Read Archive (SRA)-এর মতো বিশাল পাবলিক ডেটাবেজে প্রশ্ন করতে পারবেন যেখানে ১০০ মিলিয়ন বিলিয়নেরও বেশি ডিএনএ অক্ষর রয়েছে।
তারা সমস্যাটির সমাধান করেছেন গাণিতিক ‘গ্রাফ’ ব্যবহার করে, যা ওভারল্যাপ করা ডিএনএ অংশগুলিকে যুক্ত করে, যেমন কিছু বইয়ের সূচিতে একই শব্দের বাক্যগুলো সারিবদ্ধ থাকে।
গবেষকরা সাতটি পাবলিক ডেটাবেজের তথ্য একত্রিত করে তৈরি করেছেন ১.৮৮ কোটি অনন্য ডিএনএ ও আরএনএ সিকোয়েন্স সেট এবং ২১০ বিলিয়ন অ্যামিনো অ্যাসিড সিকোয়েন্স সেট, যেখানে জীবনের সব ক্লেডের তথ্য আছে, ভাইরাস থেকে শুরু করে মানুষ পর্যন্ত। তারা একটি সার্চ ইঞ্জিনও তৈরি করেছেন, যেখানে ব্যবহারকারীরা টেক্সট প্রম্পট দিয়ে এই বিশাল কাঁচা তথ্যভাণ্ডারে অনুসন্ধান করতে পারেন।
“এটি ডেটার সঙ্গে একেবারেই নতুনভাবে ইন্টার্যাকশনের পথ খুলে দিয়েছে,” বলেন কাহলেস। “ডেটা কমপ্রেসড, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারযোগ্য।”
MetaGraph-এর কার্যকারিতা দেখাতে গবেষকরা এটি ব্যবহার করেছেন ২,৪১,৩৮৪টি মানব অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম নমুনা বিশ্লেষণে, বিশ্বজুড়ে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ জিনের উপস্থিতি নির্ণয়ে। আগের সংস্করণ দিয়ে তারা নিউইয়র্ক ও টোকিওর সাবওয়েতে থাকা ব্যাকটেরিয়ার ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্স জিনও ট্র্যাক করেছিলেন। এবারকার বিশ্লেষণ সম্পন্ন হয়েছে মাত্র এক ঘণ্টায়, একটি শক্তিশালী কম্পিউটারে।
MetaGraph একা নয়—এর বাইরে আরও বড় মাপের জিনোম সার্চ টুল তৈরি হয়েছে।
চিকি ও বাবায়ান তৈরি করেছেন Logan নামের একটি প্ল্যাটফর্ম, যা বিলিয়ন সংখ্যক ছোট ডিএনএ সিকোয়েন্স একত্র করে দীর্ঘ, সংগঠিত ডিএনএ অংশ তৈরি করে। এতে পুরো জিন ও তার ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত করা যায়, যদিও কিছু ক্ষেত্রে MetaGraph-এর তুলনায় ফিচার কম। “আমাদের টুলের ফিচার কম, কিন্তু পারফরম্যান্স বেশি,” বলেন চিকি।
এই Logan ব্যবহার করে তারা ২০০ মিলিয়নেরও বেশি প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান প্লাস্টিক-খেকো এনজাইমের সংস্করণ আবিষ্কার করেছেন যার কিছু সংস্করণ ল্যাবে তৈরি এনজাইমের চেয়েও কার্যকর। এই গবেষণা সম্প্রতি একটি প্রিপ্রিন্টে সার্ভারে প্রকাশিত হয়েছে।
তারা এবং অন্যান্য গবেষকেরা এর আগে ভাইরাস ডিএনএ অনুসন্ধানের জন্য ছোট আকারের সার্চ টুলও তৈরি করেছিলেন, যা নতুন ভাইরাস ও ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত টি-সেল থেরাপিতে অজানা ভাইরাল দূষণ শনাক্ত করেছে।
বাবায়ানের মতে, এসব আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে দুটি কারণে: ওপেন-সোর্স সার্চ টুল, যেমন metagraph.ethz.ch ও logan-search.org এবং ওপেন পাবলিক সিকোয়েন্সিং রিপোজিটরি।
তবে তিনি সতর্ক করেছেন, অর্থায়ন কমে গেলে এসব উন্মুক্ত ডেটাবেজ টিকিয়ে রাখা কঠিন হতে পারে। “এসব সার্চ উদ্ভাবন দেখায় কেন ওপেন ডেটা শেয়ারিং এত গুরুত্বপূর্ণ,” বলেন তিনি।
“এগুলো বিশ্বজুড়ে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির জ্বালানি,” যোগ করেন বাবায়ান। “আমরা এখন ‘পেটাবেস-স্কেল জিনোমিকস’-এর এক নতুন যুগে প্রবেশ করছি আর এর সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলো এখনো আসা বাকি।”
———
Efficient and accurate search in petabase-scale sequence repositories. Nature (2025).
DOI: 10.1038/s41586-025-09603-w
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


