আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অবস্থিত একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল, যার নাম Sagittarius A*। তবে একদল গবেষক বলছেন, এটি আদৌ ব্ল্যাক হোল নাও হতে পারে। তাঁদের মতে, এটি এবং এর কাছাকাছি আকারের আরও কিছু ব্ল্যাক হোল আসলে ডার্ক ম্যাটারের ঘন জমাট অংশ হতে পারে।
ডার্ক ম্যাটার এমন এক ধরনের পদার্থ, যা আলো বা সাধারণ বস্তুর সঙ্গে প্রায় কোনো ইন্টার্যাক্ট করে না। শুধু গ্র্যাভিটির মাধ্যমেই এর অস্তিত্ব বোঝা যায়। মহাবিশ্বের মোট পদার্থের প্রায় ৮৫ শতাংশই ডার্ক ম্যাটার, অথচ এ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান সীমিত। গ্যালাক্সির ঘূর্ণন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানেন, অধিকাংশ গ্যালাক্সির চারপাশে ডার্ক ম্যাটারের একটি বিশাল হ্যালো থাকে। কিন্তু গ্যালাক্সির একেবারে কেন্দ্রে কী ঘটে, তা এখনও স্পষ্ট নয়, বলেন আর্জেন্টিনার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব লা প্লাটার গবেষক ভ্যালেন্তিনা ক্রেসপি।
ক্রেসপি ও তাঁর সহকর্মীরা অত্যন্ত হালকা কণা (ফার্মিয়ন) রূপে তৈরি ডার্ক ম্যাটার দিয়ে একটি গ্যালাক্টিক কেন্দ্রের মডেল তৈরি করেন। তাঁদের গবেষণায় দেখা যায়, এই ফার্মিয়নিক ডার্ক ম্যাটার এমন ঘন ও ভারী একটি বস্তু গঠন করতে পারে, যা দূর থেকে দেখলে প্রায় হুবহু একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের মতো মনে হয়।
গবেষণা দলের সদস্য কার্লোস আরগুয়েলেস বলেন, পৃথিবী থেকে দেখলে ব্ল্যাক হোল আর এই ডার্ক ম্যাটার কোরের মধ্যে তেমন পার্থক্য বোঝা যাবে না। তবে যদি কোনো মহাকাশযান নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করা যেত, তবে কোনো বিপদ ছাড়াই ভেতর দিয়ে পার হওয়া সম্ভব হতো। ব্ল্যাক হোলের মতো মৃত্যু ঝুঁকি থাকত না।
বাস্তবে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে মহাকাশযান পাঠানো অসম্ভব। তাই গবেষকরা তাঁদের মডেল যাচাই করেছেন Sagittarius A*–এর কাছাকাছি ঘুরতে থাকা নক্ষত্র ও গ্যাসমেঘের কক্ষপথ বিশ্লেষণ করে। এই মডেল পুরো গ্যালাক্সির ঘূর্ণনগতির তথ্য এবং ২০২২ সালে ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপে তোলা Sagittarius A*–এর সেই বিখ্যাত ছবির সঙ্গেও মিলে যায়। ছবিতে দেখা উজ্জ্বল বলয়টি অতি উতপ্ত পদার্থের তৈরি, যা ডার্ক ম্যাটার কোরের শক্তিশালী মহাকর্ষ সৃষ্টি হতে পারে।
তবে পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মিল থাকলেই ধারণাটি সত্য প্রমাণিত হয় না। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যাস্টন গিরিবেত বলেন, প্রমাণের সঙ্গে সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা মেলে ব্ল্যাক হোল ধারণার সঙ্গেই। তাই তাঁর মতে, আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা বস্তুটি ব্ল্যাক হোল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবু সব সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন, আর এই ধারণাটি নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শেপ ডোলেম্যান বলেন, ইভেন্ট হরাইজনের একেবারে কাছের অঞ্চলের পর্যবেক্ষণে এই ডার্ক ম্যাটার মডেল কতটা কার্যকর, তা স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে সেখানে দেখা চৌম্বক ক্ষেত্রের ঘূর্ণি-প্যাটার্ন ব্ল্যাক হোলের উপস্থিতিকেই সমর্থন করে।
আরেকটি সমস্যা হলো, ফার্মিয়নিক ডার্ক ম্যাটার দিয়ে সূর্যের ভরের প্রায় এক কোটি গুণের বেশি ভারী বস্তু তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। এতে একটি ব্যাখ্যা মিলতে পারে যে, এমন বস্তু ভেঙে পরে ব্ল্যাক হোলে পরিণত হয়, যা সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের জন্ম রহস্য ব্যাখ্যা করে। কিন্তু ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপে তোলা আরও বড় ব্ল্যাক হোল M87*–এর ছবিও প্রায় একই রকম। অথচ M87*–এর ভর সূর্যের প্রায় ৬.৫ বিলিয়ন গুণ। এই বিষয়টি ডার্ক ম্যাটার ধারণাকে দুর্বল করে।
গবেষকেরা স্বীকার করেন, ডার্ক ম্যাটার কোরের ধারণা ব্ল্যাক হোলের চেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় নয়, বরং কমই হতে পারে। বর্তমান যন্ত্রপাতি দিয়ে শতভাগ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়, বস্তুটি ডার্ক ম্যাটার নাকি ব্ল্যাক হোল। এত উচ্চ রেজোলিউশনের ছবি পেতে আরও বহু দশক লেগে যেতে পারে।
তবে যদি প্রমাণিত হয় Sagittarius A* আসলে ডার্ক ম্যাটারের তৈরি, তাহলে সেটি হবে যুগান্তকারী আবিষ্কার। বর্তমান কসমিক মডেল ভারী ও ধীরগতির কণাকেই ডার্ক ম্যাটারের প্রধান প্রার্থী মনে করে। ফার্মিয়নিক ডার্ক ম্যাটার সেই ধারণার বাইরে। ফলে এমন একটি কোরের অস্তিত্ব আমাদের ব্ল্যাক হোল ও পুরো মহাবিশ্ব সম্পর্কে ধারণাই পাল্টে দিতে পারে।
———
The dynamics of S-stars and G-sources orbiting a supermassive compact object made of fermionic dark matter. Monthly Notices of the Royal Astronomical Society (2026).
DOI: 10.1093/mnras/staf1854
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


