প্রায় তিনশো কোটি বছর ধরে এককোষী জীবেরা পৃথিবীর বুকে রাজত্ব করেছে। তারপর প্রায় একশো কোটি বছর আগে জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। তখনই প্রথম দলবদ্ধভাবে থাকার চেষ্টা টিকে যায়, আর সেখান থেকেই প্রাণী, উদ্ভিদ ও ছত্রাকসহ জটিল জীবের বিবর্তনের পথ খুলে যায়।
এক গবেষণা বলছে, পৃথিবীতে পরিচিত সব জীবের মধ্যে কমপক্ষে ৪০ বার বহুকোষী হওয়ার প্রক্রিয়া ঘটেছে। তবে প্রাণিজগতে এই পরিবর্তনটি সম্ভবত মাত্র একবারই ঘটেছে।
২০০০ সালের গোড়ার দিকে এই বিস্ময়কর ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিজ্ঞানীরা কিছু অপ্রত্যাশিত জিনিস আবিষ্কার করেন। আগে ধারণা ছিল, বহুকোষী জীব গঠনের জন্য বিপুল সংখ্যক নতুন জিনের আবির্ভাব প্রয়োজন যাতে কোষগুলো একসঙ্গে লেগে থাকতে পারে, রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে এবং জিনের প্রকাশকে সমন্বিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করে প্রত্যেকটি কোষকে বিশেষায়িত করে তুলতে পারে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেল, অনেক এককোষী জীবের মধ্যেই প্রাণীদের বহুকোষী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিনগুলো বিদ্যমান। অর্থাৎ, বহুকোষীত্বের জন্য যে আণবিক সরঞ্জাম দরকার, তা প্রাণী আবির্ভাবের বহু আগে থেকেই তৈরি ছিল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজির বিবর্তনবিদ উইলিয়াম র্যাটক্লিফ বলেন, “এই কাজ আমাদের প্রাণী-উৎপত্তি নিয়ে ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। আমাদের নতুন প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করছে।”
এই গবেষণার পেছনে থাকা দুই প্রধান বিজ্ঞানী হলেন ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি, বার্কলের বিবর্তনবিদ ও জেনেটিসিস্ট নিকোল কিং এবং স্পেনের বার্সেলোনায় ইন্সটিটিউট অফ ইভোলিউশনারি বায়োলজির ইনাকি রুইজ-ত্রিলো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের দল বড় হয়ে এখন এক ছোট বৈজ্ঞানিক কমিউনিটিতে রূপ নিয়েছে, যারা এক ডজনেরও বেশি প্রজাতিকে মডেল অর্গানিজম হিসেবে গড়ে তুলেছে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে। এসব প্রজাতির সবাই ইউক্যারিয়োট। এরা প্রোক্যারিয়োটদের থেকে আলাদা কারণ এদের নিউক্লিয়াস রয়েছে। এদের মধ্যে প্রাণীর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হলো: কোয়ানোফ্লাজেলেট (choanoflagellate), ফিলাস্টেরিয়ান (filasterean), ইখথিওস্পোরিয়ান (ichthyosporean) এবং কোরালোকাইট্রিয়ান (corallochytrean)। মজার ব্যাপার, এই প্রজাতিগুলোর অনেকেই মাঝে মাঝে দলবদ্ধ হয়ে উপনিবেশ গঠন করে বহুকোষীতার দিকে ঝুঁকে পড়ে।
ক্রেডিট: I. Ruiz-Trillo, et al.
বিজ্ঞানীরা বলেন, এসব জীবকে আকর্ষণীয় করে তোলে এদের বৈচিত্র্য চেহারা, জীবনচক্র এবং জেনেটিক বৈশিষ্ট্যে। প্রতিটি প্রজাতিই প্রাণীতে রূপান্তরের সম্ভাব্য বিবর্তনীয় পথের এক ঝলক দেখায়। একাধিক শাখার তথ্য একত্র করে ঘটনাটি বোঝার চেষ্টা করা এখন এই বৈজ্ঞানিক কমিউনিটির মূল দর্শন হয়ে উঠেছে। বার্সেলোনার গবেষক এলেনা কাসাকুবের্তা (রুইজ-ত্রিলোর সঙ্গে একটি গবেষণাগার চালান) বলেন , “শুধুমাত্র তুলনা করার মাধ্যমেই আমরা আসল ছবির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারব।”
সেরা মডেল
নিকোল কিং বহুকোষীতার গবেষণার শুরুতেই যে জীবটির ওপর কাজ করেছিলেন তার নাম Salpingoeca rosetta। এটি choanoflagellate নামে পরিচিত এক গ্রুপের অন্তর্গত, যারা প্রাণীর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ জীবিত আত্মীয়। এরা প্রায় ৬০০ মিলিয়ন বছর আগে প্রাণীদের সঙ্গে একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
ক্রেডিট: Mark Dayel
অন্য choanoflagellate-দের মতো, S. rosetta–এর একটি গোলাকার কোষদেহ রয়েছে, যার চারপাশে পাতলা ঝিল্লির তৈরি কলার আকৃতির মাইক্রোভিলি থাকে। এগুলো দিয়ে তারা ব্যাকটেরিয়া ধরে খায়। আর খাবার জোগাড় হয় এক লম্বা লেজ বা ফ্ল্যাজেলামের সাহায্যে। ২০০০ সালে ভিরজিনিয়ার উপকূলীয় কাদামাটি থেকে প্রথম এটি সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু পরে বিজ্ঞানীরা কোনো বন্য পরিবেশে এদের আর খুঁজে পাননি। নির্দিষ্ট পরিবেশে এদের কোষ ক্লোনাল বিভাজনের মাধ্যমে জেনেটিক্যালি অভিন্ন ডটার (কণ্যা) কোষ তৈরি করে, যা একত্র হয়ে ফুলের মতো রোসেট (rosette) আকারে উপনিবেশ গঠন করে। কিন্তু কিং প্রথমে যখন ল্যাবরেটরিতে কাজ শুরু করলে, তখন তিনি কোনোভাবেই এদের এককোষী অবস্থা থেকে বের করতে পারছিলেন না। হঠাৎ এক পরীক্ষায় ধরা পড়ে, একটি নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়া শিকারের নিঃসৃত রাসায়নিক এ কোষগুলোকে বিভাজন শুরু করতে সংকেত দেয়।
রোসেট গঠন ছাড়াও এই জীবটির আরও অন্তত একটি বহুকোষী রূপ রয়েছে, সঙ্গে রয়েছে কিছু ভিন্নধর্মী অবাধ-জীবিত কোষ। উদাহরণস্বরূপ, সংকীর্ণ স্থানে আটকে পড়লে এরা লেজ গুটিয়ে নিয়ে অ্যামিবার মতো আকারহীন হয়ে যায় এবং ফিলোপোডিয়া নামের সরু শুঁড় বাড়িয়ে এগোয়।
এদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি, সান ফ্রান্সিসকোর বায়োকেমিস্ট ডেভিড বুথ বলেন, “এরা নানা পরিবেশগত সংকেতের জবাবে অবিশ্বাস্য রকমের বৈচিত্র্য দেখায়।”
২০০৩ সালে, নিকোল কিং ও তাঁর সহকর্মীরা choanoflagellate প্রজাতির মধ্যে সেল-অ্যাডহিসিভ (cell adhesion) এবং কোষ-সংকেত প্রেরণের (cell signalling) সঙ্গে যুক্ত প্রোটিন খুঁজে পান। পরে তাঁরা S. rosetta–র জিনোম সিকোয়েন্স করে বহুকোষীতার জন্য আরও বিস্তারিত এক আণবিক টুলকিট আবিষ্কার করেন।
Salpingoeca rosetta–কে বলা হয় choanoflagellate-দের ড্রোসোফিলা। কারণ এটি নিয়েই সবচেয়ে বেশি গবেষণা করা হয়েছে এবং এর জিনোম সরাসরি বদলানোর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রযুক্তি তৈরি করা হয়েছে। ২০১৮ সালে কিং-এর ল্যাবে পোস্টডক করার সময়, ডেভিড বুথ ও তাঁর সহকর্মীরা এ জীবের মধ্যে ফ্লুরোসেন্ট প্রোটিন তৈরি করতে সক্ষম করার DNA যুক্ত করেন। ২০২০ সালে তাঁরা CRISPR প্রযুক্তি ব্যবহার করে এর জিনোম সম্পাদনার পদ্ধতিও আবিষ্কার করেন। এইসব প্রযুক্তি গবেষকদের হাতে এমন এক সুযোগ এনে দিয়েছে, যাতে তাঁরা সরাসরি বহুকোষীতার জন্য সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ জিন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারেন এবং সেই জিন থেকে উৎপন্ন প্রোটিনকে বিশ্লেষণ করতে পারেন।
এই টুলের সাহায্যে টেক্সাস ইউনিভার্সিটি, অস্টিনের মাইক্রোবায়োলজিস্ট এরিয়েল ওজনিকা (কিং-এর সাবেক গ্র্যাজুয়েট ছাত্র) খুঁজে দেখছেন কীভাবে choanoflagellate-রা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণের প্রতিক্রিয়া জানায়। একইভাবে, কিং-এর ল্যাবের সাবেক পোস্টডক ও বর্তমানে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির বায়োকেমিস্ট ফ্লোরেন্টিন রুটাগানিরা গবেষণা করছেন টাইরোসিন কাইনেজ (tyrosine kinase) নামে একধরনের এনজাইম নিয়ে, যা প্রাণীদের কোষ-সংকেত প্রেরণের প্রধান ভিত্তি, আর আশ্চর্যজনকভাবে S. rosetta–তেও প্রায় সমসংখ্যায় বিদ্যমান।
মাস্টার অ্যাগ্রিগেটর
Capsaspora owczarzaki হলো ফিলাস্টেরিয়ান (filasterean) শ্রেণির সদস্য, যারা প্রাণীর সঙ্গে অভিন্ন পূর্বপুরুষ থেকে কোয়ানোফ্লাজেলেটদের চেয়ে কয়েক শ’ মিলিয়ন বছর আগে আলাদা হয়ে গেছে।
ক্রেডিট: H. Suga et al.
ইনাকি রুইজ-ত্রিলো এই জীবটির প্রতি প্রথম আগ্রহী হন পোস্টডক অবস্থায়, যখন কিং-এর ল্যাব S. rosetta নিয়ে কাজ শুরু করছিল। তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা আবিষ্কার করেন যে C. owczarzaki–ও প্রাণীদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বলে মনে হয়। তিনি কোয়ানোফ্লাজেলেট ছাড়া অন্য শাখাগুলোও গবেষণায় আনেন, কারণ একাধিক শাখা নিয়ে কাজ করলে প্রাণীদের অভিন্ন পূর্বপুরুষ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া সম্ভব।
২০১৩ সালে C. owczarzaki–র জিনোম সিকোয়েন্স করার পর তাঁরা জানান, এ জীবটির মধ্যে বহুকোষীতার সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক জিন রয়েছে যার কিছু আবার কোয়ানোফ্লাজেলেটদের মধ্যে নেই। যেমন ইন্টেগ্রিন (integrin) নামে সেল-সার্ফেস প্রোটিন তৈরি করা জিন, যা কোষগুলোকে একে অপরের সঙ্গে এবং পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত রাখে।
২০০২ সালে এক মিঠাপানির শামুকের শরীরে প্রথম C. owczarzaki জীবটি আবিষ্কৃত হয়। এর জীবনচক্রের বেশিরভাগ সময় এটি এককোষী অ্যামিবার মতো থাকে। তবে পরিবেশগত সংকেত পেলে এরা বহুকোষী পর্যায়ে যায়, যেখানে অনেক কোষ একত্র হয়ে ক্রমে বড় বড় দল বা অ্যাগ্রিগেট গঠন করে। এই বহুকোষী হওয়ার পথটি কোয়ানোফ্লাজেলেটদের ক্লোনাল বিভাজনের মতো নয়। রুইজ-ত্রিলো বলেন, এতদিন ধারণা ছিল “ক্লোনাল বিভাজনই প্রাণী হওয়ার প্রধান পথ।”
প্রাণীর ভ্রূণ বিকাশে এককোষ থেকে অনেক কোষ তৈরি হয়, যেগুলোর জিনোম অভিন্ন থাকে। এতে করে কোষগুলোর মধ্যে কোনো জেনেটিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয় না। তাই স্বাভাবিকভাবে অনুমান করা হয়েছিল, প্রাণীর বিবর্তনের প্রথম ধাপও হয়তো ক্লোনাল বিভাজন। কিন্তু রুইজ-ত্রিলো বলেন, অ্যাগ্রিগেশন বা একত্রিত হওয়া বহু ইউক্যারিয়োট শাখায় বিদ্যমান, যা দ্রুত ও সহজ উপায়ে গঠন তৈরি করতে সহায়ক। তাই এই প্রক্রিয়াটিকেও গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত।
গবেষণায় দেখা গেছে, C. owczarzaki অ্যাগ্রিগেট পর্যায়ে বহুকোষীতার গুরুত্বপূর্ণ কিছু জিন ব্যবহার করে। রুইজ-ত্রিলোর মতে, হয়তো অ্যাগ্রিগেশনই প্রাণীর বিবর্তনে অপরিহার্য ধাপ ছিল, অথবা হতে পারে এটি প্রক্রিয়ার একটি অংশমাত্র।
C. owczarzaki এমন কিছু এককোষী প্রজাতির একটি, যেগুলো কাসাকুবের্তা ও রুইজ-ত্রিলো আনন্দের সঙ্গে অন্য ল্যাবগুলোতে পাঠিয়ে দেন গবেষণার জন্য।
দ্বৈত চরিত্রের অধিকারী
২০১৭ সালে আরেকটি কোয়ানোফ্লাজেলেট প্রজাতি হঠাৎ আবিষ্কৃত হয়, নাম Choanoeca flexa। এটি দেখায় যে শুধু এই গোষ্ঠীতেই কত ভিন্নতা থাকতে পারে। ফ্রান্সের পাস্তুর ইন্সটিটিউটের বিবর্তনীয় সেল-বায়োলজিস্ট থিবো ব্রুনে (কিং-এর ল্যাবের সাবেক পোস্টডক) ক্যারিবিয়ান দ্বীপ কুরাসাও-তে এক কর্মশালায় অংশ নেওয়ার সময় সহকর্মীদের সঙ্গে মিলে এ জীবটি আবিষ্কার করেন। দ্বীপে ঘুরতে ঘুরতে অগভীর জোয়ারের পুকুর থেকে পানি সংগ্রহ করার পর তাঁরা মাইক্রোস্কোপে তাকিয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান।
ক্রেডিট: Benjamin T. Larson
প্রতিটি কোষ দেখতে অনেকটা S. rosetta–র মতো হলেও এরা একসঙ্গে মিলিত হয়ে একপাশ খোলা পাতলা স্তর তৈরি করে, যেখানে সব ফ্ল্যাজেলাম একই দিকে থাকে। আলো বা অন্ধকারের প্রতিক্রিয়ায় এরা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বাঁক বদলে ভেতর-বাহির হয়ে যায়, যেন কোনো শিশুর খেলনা বা উল্টে যাওয়া ছাতা। ব্রুনে বলেন, “আমরা সেটা দেখে এতটাই অবাক হয়েছিলাম যে চিৎকার করে লাফালাফি শুরু করি। সম্ভবত আমাদের কর্মকাণ্ড দেখতে তখন ভীষণ হাস্যকর লেগেছিলো।”
যদিও এ জীবের জিনোম নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি এখনও পুরোপুরি তৈরি হয়নি, তবুও মডেল অর্গানিজম হিসেবে C. flexa–র একটি বড় সুবিধা রয়েছে। অন্য অনেক জীব শুধু ল্যাবরেটরিতে আবিষ্কারের পরই গবেষণায় ব্যবহৃত হয়, পরে আর প্রকৃতিতে খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু C. flexa বারবার একই জোয়ারের পুকুর থেকে সংগ্রহ করা গেছে। ব্রুনেটের ল্যাবের পোস্টডক ও বিবর্তনবিদ নুরিয়া রোস-রোচার বলেন, “আমরা ভাগ্যবান ছিলাম, কারণ এভাবে আমরা প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরে গিয়ে বুঝতে পেরেছি এ জীবটির বহুকোষী আচরণের সঙ্গে পরিবেশের কী সম্পর্ক।”
ওই জোয়ারপুকুরগুলোতে প্রায়ই হঠাৎ পরিবর্তন ঘটে। কয়েক দিনের মধ্যেই পানি গরম হয়ে বাষ্পীভূত হয়, ফলে জীবগুলো হঠাৎ তীব্র লবণাক্ততায় ভাসমান অবস্থায় পড়ে যায় অথবা শুকনো কাদায় আটকে যায়, এরপর আবার জোয়ার এসে তাদের ঢেকে ফেলে। ব্রুনে ও তাঁর দল আবিষ্কার করেন যে C. flexa, S. rosetta–র মতোই ক্লোনাল বিভাজনের মাধ্যমে এককোষী থেকে বহুকোষী রূপ নিতে পারে। তবে এরা অ্যাগ্রিগেশনও ব্যবহার করে, আর কখনো কখনো দুই কৌশল একসঙ্গে মিশিয়েও চলে।
তবে পানি যখন অতিরিক্ত নোনতা হয়ে ওঠে, তখন C. flexa কেবলমাত্র অ্যাগ্রিগেশন ব্যবহার করে। রোস-রোচার বলেন, “আমরা মনে করি এই ক্ষণস্থায়ী পরিবেশই হয়তো এমন এক নির্বাচনী চাপ তৈরি করেছে, যা বহুকোষীতার এই মিশ্র ধরণকে বিবর্তিত করেছে।”
এই জীবটির নানা কৌশল থেকে বোঝা যায়, অন্য অনেক অণুজীবের মধ্যেও হয়তো বিস্ময়কর জটিলতা অপেক্ষা করছে। ব্রুনে বলেন, “এই জীবগুলো আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি সৃজনশীল।”
ক্যামেরা-রেডি আত্মীয়
আরেকটি মডেল অর্গানিজম হলো Sphaeroforma arctica, যা Ichthyosporea নামে এক শাখার সদস্য। এরা কোয়ানোফ্লাজেলেট বা ফিলাস্টেরিয়ানদের তুলনায় প্রাণীর চেয়ে আরও দূর আত্নীয়। প্রায় এক বিলিয়ন বছর আগে প্রাণীর অভিন্ন পূর্বপুরুষ থেকে এরা আলাদা হয়ে যায়। আর অন্যদের মতো নয়, ইখথিওস্পোরিয়ানদের কোষপ্রাচীর আছে যা উদ্ভিদ ও ছত্রাকে দেখা যায়, কিন্তু প্রাণীদের মধ্যে অনুপস্থিত।
ক্রেডিট: I. Ruiz-Trillo et al.
অনেক ইখথিওস্পোরিয়ান সামুদ্রিক ও অন্যান্য প্রাণীর শরীরে পরজীবী বা সহাবস্থায়ী হিসেবে থাকে। S. arctica ২০০২ সালে একটি আর্কটিক ক্রাস্টাশিয়ানের অন্ত্র থেকে আলাদা করা হয়।
সুইজারল্যান্ডের জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় সেল-বায়োলজিস্ট ওমায়া দুদিন ২০১৭ সালে রুইজ-ত্রিলোর ল্যাবে পোস্টডক করার সময় থেকে S. arctica নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। আংশিক কারণ ছিল, এ জীবটিকে একপ্রকার “সহজ শিকার” বলা যায়। তিনি বলেন, “এটি নড়ে না, খুব সহজে ছবি তোলা যায়, সবসময় গোলাকার থাকে এবং জীবনচক্রে অত্যন্ত নির্ভুল।”
যদিও S. arctica জীবনচক্রের মাত্র ২% সময় বহুকোষী রূপে থাকে, তবুও সেখানে কীভাবে পৌঁছায় তা বেশ প্রেডিক্টবেল। এটি বহুকোষী রূপে পৌঁছে কোয়েনোসাইটিক ডেভেলপমেন্ট (coenocytic development) নামক প্রক্রিয়ায়, যা একধরনের ক্লোনাল বিভাজন। এ প্রক্রিয়ায় একটি কোষের নিউক্লিয়াস বারবার বিভাজিত হয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যক নিউক্লিয়াস তৈরি করে, তারপর কোষটি ভেঙে যায়।
শেষ ধাপটি দ্রুত ঘটে, কিন্তু দুদিন ও তাঁর সহকর্মীরা পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছেন কীভাবে সমন্বিত ধাপে কোষঝিল্লি ভেতরে ঢুকে গিয়ে প্রতিটি নিউক্লিয়াসকে ঘিরে ফেলে। তিনি বলেন, এ প্রক্রিয়াটি মোটামুটি কীটপতঙ্গের ভ্রূণ বিকাশের মতো, আর এখানে সক্রিয় হওয়া কিছু জিনও কীটপতঙ্গের বিকাশে সক্রিয় হয়। দুদিন বলেন, এসব ইঙ্গিত দেয় যে কিছু উন্নয়নমূলক প্রক্রিয়া প্রাণী আসার আগেই তৈরি হয়েছিল।
বিকাশের আয়না
পরে দুদিন আরেকটি ইখথিওস্পোরিয়ান নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। ২০১৭ সালে হাওয়াইয়ের সামুদ্রিক তলানিতে পাওয়া Chromosphaera perkinsii দেখতে এককোষী অবস্থায় S. arctica–র মতোই গোলাকার। তবে এটির বহুকোষী হওয়া ভিন্ন পথে ঘটে যা এর জীবনচক্রের ৩০–৪০% সময়জুড়ে থাকে।
ক্রেডিট: Dudin Lab
২০২১ সালে দুদিন প্রথম এই পরিবর্তন দেখেন এবং সেটিকে প্রায় ভুল করে ফেলেছিলেন প্রাথমিক পর্যায়ের ইঁদুরের ভ্রূণের দ্রুত কোষবিভাজন ভেবে। প্রায় ৩০ ঘণ্টা ধরে এ জীবের কোষগুলো ক্লোনালভাবে বিভাজিত হয়ে এক হাজারেরও বেশি কোষের কলোনি তৈরি করে। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এ বহুকোষী রূপে অন্তত দুই ধরনের কোষ থাকে, আর তারা জায়গা অনুযায়ী আলাদা অবস্থান নেয়। প্রাণীদের মধ্যে শ্রমবিভাজনের জন্য এ ধরণের স্থানভিত্তিক সংগঠন অপরিহার্য। দুদিন বলেন, “এই কলোনিগুলো অত্যন্ত উন্নত সংগঠন প্রদর্শন করে। যে কারণে তারা এটা করতে সক্ষম, সেটিই আমাদের কাছে জীবের গঠন কীভাবে তৈরি হয় তা বোঝার কেন্দ্রে রয়েছে।”
এ প্রক্রিয়াটি কতটা প্রাণীদের কোষ-বিশেষায়নের মতো? এটা কি ভ্রূণ বিকাশের পূর্বসূরি হতে পারে? নাকি একেবারেই আলাদা পথে বিবর্তিত হয়েছে? দুদিন বলেন, “পুরো ক্যারিয়ারটাই লাগবে এ সব রহস্যের সমাধান করতে।”
ব্রুনে মজা পান এসব মডেল অর্গানিজমের বহুকোষীতার নানা কৌশল দেখে যা তিনি “প্রকৃতির উদ্দাম পরীক্ষানিরীক্ষা” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। রুইজ-ত্রিলো মনে করেন, এমন আরও অনেক কৌশল হয়তো আবিষ্কারের অপেক্ষায় আছে; হয়তো এখনও অজানা এমন কিছু শাখা রয়েছে যেগুলো প্রাণীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। বহুকোষীতার রূপান্তর অন্য গোষ্ঠীতেও (যেমন শৈবাল, উদ্ভিদ ও ছত্রাক) গবেষণা করে নতুন বিকল্প কৌশল খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।
রোস-রোচার বলেন, “আমার মনে হয় এ ক্ষেত্র এখন সোনালি যুগে আছে। এত প্রশ্ন বাকি, আর সবাই একসঙ্গে উত্তর খুঁজতে উদগ্রীব।”
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।








