বেশিরভাগ মানুষ প্রতিদিন রাতে প্রায় আট ঘণ্টা ঘুম ছাড়া স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন যারা মাত্র তিন ঘণ্টা ঘুমিয়েও পুরোপুরি সতেজ ও কর্মক্ষম থাকেন। সম্প্রতি Proceedings of the National Academy of Sciences (PNAS)–এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এমন এক বিরল জিনগত পরিবর্তনের সন্ধান পেয়েছেন, যা কারো ঘুমের চাহিদা স্বাভাবিকের চেয়ে কমিয়ে দিতে পারে।
প্রাকৃতিকভাবে যেসব মানুষ প্রতিদিন তিন থেকে ছয় ঘণ্টা ঘুমান কিন্তু তারপরও তাদের চলাফেরায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায় না—তাদের জিনগত বৈশিষ্ট্য বুঝতে পারলে ইনসোমনিয়া বা অতিরিক্ত ঘুমের মতো বিভিন্ন ঘুমের সমস্যার চিকিৎসা আবিষ্কারে সহায়তা মিলতে পারে, বলছেন গবেষক এবং ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, সান ফ্রান্সিসকোর নিউরোসায়েন্টিস্ট ও জেনেটিসিস্ট ইং-হুই ফু।
তিনি বলেন, “আমরা যখন ঘুমাই, তখনো আমাদের শরীর কাজ করতে থাকে—নিজেকে পরিশুদ্ধ করে ও ক্ষতিগ্রস্ত কোষ মেরামত করে। যেসব মানুষ খুব অল্প ঘুমেই সুস্থ থাকেন, তাদের শরীর এসব কাজ অনেক বেশি দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে পারে।”
২০০০ সালের দিকে ফু ও তার সহকর্মীরা এমন কিছু মানুষের কাছ থেকে শুনতে পান, যারা রাতে মাত্র ছয় ঘণ্টা বা তার কম ঘুমান। একটি মা ও মেয়ের জিন বিশ্লেষণ করে গবেষক দল দেখতে পান, তাদের ঘুম–জাগরণ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক একটি জিনে একটি বিরল মিউটেশন (জিনগত পরিবর্তন) রয়েছে। গবেষকরা ধারণা করেন, এই মিউটেশনই ওই পরিবারের ঘুম কম লাগার কারণ। এরপর থেকে অনেক ঘুম-কম-লাগা মানুষ ফু-এর গবেষণাগারে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য যোগাযোগ করতে থাকেন।
এখন পর্যন্ত গবেষকেরা কয়েকশো প্রাকৃতিকভাবে কম ঘুমানো ব্যক্তির খোঁজ পেয়েছেন। তাদের গবেষণায় এখন পর্যন্ত চারটি জিনে পাঁচটি ভিন্ন মিউটেশনের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা এই বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তবে দেখা গেছে, বিভিন্ন পরিবারের মধ্যে মিউটেশনগুলো ভিন্ন ভিন্ন রকমের।
নতুন এক মিউটেশনের খোঁজ
সাম্প্রতিক গবেষণায় গবেষকেরা একজন প্রাকৃতিকভাবে কম ঘুমানো ব্যক্তির ডিএনএ বিশ্লেষণ করে নতুন এক মিউটেশনের খোঁজ পান। এটি ছিল SIK3 নামের একটি জিনে, যেটি একটি বিশেষ এনজাইম উৎপন্ন করে। এই এনজাইম স্নায়ুকোষগুলোর মাঝের ফাঁকে সক্রিয় থাকে। এর আগে জাপানি গবেষকেরা এই একই জিনের এক ভিন্ন মিউটেশন ইঁদুরে অতিরিক্ত ঘুমের কারণ হতে দেখেছেন।
গবেষক দল নতুন মিউটেশনটি ইঁদুরের জিনে প্রয়োগ করে দেখতে পান, যেসব ইঁদুরে এই পরিবর্তন ছিল, তারা অন্য ইঁদুরের তুলনায় প্রতিদিন গড়ে ৩১ মিনিট কম ঘুমাচ্ছে। সাধারণত ইঁদুর দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টা ঘুমায়। গবেষণায় আরও দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট এনজাইমটি সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে মস্তিষ্কের সিন্যাপসে—মানে, স্নায়ু কোষের সংযোগস্থলে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, এই মিউটেশন সম্ভবত ঘুমের সময় মস্তিষ্কের স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার প্রক্রিয়াকে আরও দক্ষ করে তোলে।
তবে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের নিউরোলজিস্ট ক্লিফোর্ড স্যাপার বলেন, যেহেতু এই মিউটেশনের কারণে ইঁদুর মাত্র অল্প সময়ের ঘুম হারায়, তাই এটি একমাত্র বা প্রধান কারণ না ও হতে পারে। তবে এটি SIK3 জিন সম্পর্কে পূর্বের গবেষণার সঙ্গে ভালোভাবেই মেলে এবং ঘুমের জৈবিক ভিত্তি বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
গবেষকরা এখনো খতিয়ে দেখছেন, কীভাবে এসব জিন ও তাদের ভিন্নতা ঘুমকে প্রভাবিত করে। ফু আশাবাদী, ভবিষ্যতে যদি আরও মিউটেশন চিহ্নিত করা যায়, তাহলে মানুষে ঘুমের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বোঝা সহজ হবে—যা একদিন ঘুম সংক্রান্ত রোগের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
———
The SIK3-N783Y mutation is associated with the human natural short sleep trait, Proc. Natl. Acad. Sci. (2025)
DOI: 10.1073/pnas.2500356122
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


