বাংলাদেশে পোল্ট্রি খাত শুধু খাদ্য সরবরাহই নয়, লাখো মানুষের জীবিকারও প্রধান ভরসা। কিন্তু বাণিজ্যিক মুরগির খামারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের চিত্র ভয়াবহ আকার নিয়েছে। গত ১৭ আগস্ট, ২০২৫ তারিখে Scientific Reports জার্নালে সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৯৩ শতাংশ খামারই মুরগি পালনের সময় অন্তত একবার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেছে।
২০২১ সালে ঢাকার আশপাশের ছয় জেলা ও কক্সবাজারে মোট ৩৪০টি খামারে জরিপ চালিয়ে গবেষকরা দেখেছেন, মাত্র ৩১ শতাংশ খামারি জানেন আসলে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ (AMR) কী। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পশুচিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ বিক্রেতা, খাদ্য সরবরাহকারী, কিংবা খামারির নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ ব্যবহার হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া হয় মাংসের মুরগিতে। ব্রয়লার খামারের ৭৮ শতাংশ এবং সোনালি খামারের ৬৭ শতাংশ মুরগিকে নিয়মিত এ ওষুধ দেওয়া হয়। ডিমপাড়া লেয়ার খামারে এই হার তুলনামূলক কম (৪১%)। তবে সমস্যার জায়গা হলো ওষুধ ব্যবহারের ধরন। প্রায় অর্ধেক খামারি “একই সঙ্গে একাধিক অ্যান্টিবায়োটিক” ব্যবহার করেন, আবার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খামার পুরনো বা অবশিষ্ট ওষুধ (left-over antibiotics) ব্যবহার করেন, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সরাসরি ঝুঁকিপূর্ণ।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কেবল ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ নয়, খামারিরা ভাইরাসজনিত কিংবা অজানা অসুস্থতার ক্ষেত্রেও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেন। কেউ কেউ আবার ‘যদি লাগে’ ভেবে একেবারে ডে-ওল্ড চিক বা একদিন বয়সী বাচ্চা মুরগিকেও ওষুধ খাওয়ান।
সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তালিকায় থাকা ‘অত্যন্ত জরুরি ওষুধ’ (Highest Priority Critically Important Antimicrobials) যেমন ফ্লুরোকুইনোলোন, মাক্রোলাইড এমনকি কোলিস্টিনও খামারে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ওষুধগুলো সাধারণত মানুষে গুরুতর সংক্রমণের চিকিৎসায় শেষ ভরসা হিসেবে রাখা হয়। খামারে নির্বিচারে প্রয়োগের ফলে এর কার্যকারিতা কমে গেলে সাধারণ মানুষের জন্য ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হবে।
আরেকটি আশ্চর্য তথ্য হলো যাদের খামারি হিসেবে অভিজ্ঞতা বেশি (য১০ বছরের বেশি) তাদের মধ্যেই ভুল ব্যবহারের প্রবণতা বেশি পাওয়া গেছে। মনে হচ্ছে দীর্ঘদিনের অভ্যাস ও ‘আমরা জানি’ মনোভাব তাদের সঠিক প্র্যাকটিস থেকে দূরে রাখছে। বিপরীতে লেয়ার খামারিরা তুলনামূলকভাবে সচেতন; তারা পশুচিকিৎসকের পরামর্শ বেশি নেন এবং চিকিৎসা উদ্দেশ্যে সঠিকভাবে ওষুধ ব্যবহার করেন।
গবেষক দল বলছে, বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে আইন-কানুন থাকলেও প্রয়োগ খুবই দুর্বল। ফলে খামারিদের হাতে ওষুধ পৌঁছে যাচ্ছে সহজেই, আর সঠিক প্রশিক্ষণের অভাবে তারা তা ভুলভাবে ব্যবহার করছেন। এর ফলাফল দাঁড়াচ্ছে মুরগির মাংস ও ডিমে ওষুধের অবশিষ্টাংশ (residue), এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার। উভয় ক্ষেত্রেই সাধারণ ভোক্তাদের স্বাস্থ্যে গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে।
গবেষকদের মতে, এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ (AMR) ভয়াবহ আকার নিতে পারে, যার প্রভাব শুধু খামারে নয়, মানুষের জীবনেও পড়বে।
———
Determinants of indiscriminate antimicrobial use in commercial chicken farms in Bangladesh and their impact on food safety and public health. Sci Rep (2025).
DOI: 10.1038/s41598-025-14108-7
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


