কল্পনা করুন, একটি নাকের স্প্রে আপনাকে শুধু কোভিড-১৯ বা ফ্লু নয়, সব ধরনের শ্বাসযন্ত্রের রোগ থেকেই সুরক্ষা দিচ্ছে। গতকাল (১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) Science জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এমন একটি টিকার কথা জানিয়েছেন। ইঁদুরের ওপর পরীক্ষায় এই নাসিকায় প্রয়োগযোগ্য টিকা অন্তত তিন মাস ধরে একাধিক ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে কোভিড-১৯ সৃষ্টিকারী SARS-CoV-2 ভাইরাস। এমনকি শ্বাসযন্ত্রের অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়াও কমিয়েছে।
এই গবেষণার ফলাফল যদি মানুষের ক্ষেত্রেও নিরাপদ ও কার্যকর প্রমাণিত হয়, তাহলে শীত মৌসুম শুরুর আগেই সবার জন্য একটি ‘সর্বজনীন টিকা’ দেওয়া সম্ভব হতে পারে। ভবিষ্যতের মহামারি প্রতিরোধেও এটি প্রথম প্রতিরক্ষা স্তর হিসেবে কাজ করতে পারে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিউনোলজিস্ট বালি পুলেন্দ্রন ও তাঁর দল আগে বিসিজি টিকা নিয়ে গবেষণা করেছেন। সেভ টিকা অল্প সময়ের জন্য বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়। মূলত জন্মগত রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করে এই সুরক্ষা তৈরি হয়।
এই জন্মগত রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা অ্যাডাপ্টিভ রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃতভাবে কাজ করে। সাধারণ টিকা অ্যাডাপ্টিভ ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে নির্দিষ্ট জীবাণুকে চিনতে শেখায়। অন্যদিকে, জন্মগত ব্যবস্থাকে সক্রিয় করলে শ্বাসনালির এপিথেলিয়াল কোষ সংক্রমণ প্রতিরোধে সক্ষম হয়। এই কোষগুলোই বহু জীবাণুর প্রধান লক্ষ্য।
নতুন গবেষণায় তিনটি উপাদান নিয়ে একটি টিকা তৈরি করা হয়েছে। প্রথম দুটি উপাদান নির্দিষ্ট রিসেপ্টর সক্রিয় করে ফুসফুসে থাকা ম্যাক্রোফেজের মতো রোগপ্রতিরোধ কোষকে উদ্দীপিত করে। তৃতীয় উপাদানটি টি-সেলের একটি অংশকে সক্রিয় করে, যারা জন্মগত ব্যবস্থাকে দীর্ঘ সময় সক্রিয় রাখার সংকেত পাঠায়। এই অংশটি না থাকলে দ্রুতই রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।
চার ডোজ নাসিকায় প্রয়োগের পর ইঁদুররা করোনাভাইরাসসহ নানা ভাইরাস এবং কিছু ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে সুরক্ষা পায়। পাশাপাশি, ধুলাবালির অ্যালার্জি থেকে সৃষ্ট হাঁপানির প্রবণতাও কমে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই টিকা দুই স্তরের সুরক্ষা তৈরি করে। প্রথম স্তর শ্বাসনালির শ্লেষ্মা ঝিল্লিতে বাধা তৈরি করে জীবাণুর প্রবেশ কমায়। দ্বিতীয় স্তর দ্রুত সক্রিয় হয়ে ঢুকে পড়া অল্পসংখ্যক জীবাণুকে নির্মূল করে।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিউনোবায়োলজিস্ট আকিকো ইওয়াসাকি এই গবেষণাকে চমৎকার বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, মানুষের শরীরে কার্যকর হলে ফলাফল অসাধারণ হতে পারে। তবে কানাডার ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝোউ শিং সতর্ক করেছেন, ইঁদুরের ফলাফল সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নাও হতে পারে। নাকের স্প্রে মানুষের ফুসফুসে পর্যাপ্তভাবে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। চার ডোজ প্রয়োগ বড় পরিসরে বাস্তবায়নকেও জটিল করে তুলতে পারে।
আরও একটি উদ্বেগ হলো, দীর্ঘ সময় রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে অতিসক্রিয় রাখলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগের আগে সতর্ক নিরাপত্তা পরীক্ষা জরুরি।
প্রাথমিক নিরাপত্তা পরীক্ষায় সমস্যা না দেখা গেলে পরবর্তী ধাপে ভলেন্টিয়ারদের নিয়ন্ত্রিতভাবে ফ্লু ভাইরাসে সংক্রমিত করে সুরক্ষা যাচাই করা হবে। সফল হলে এটি প্রতিরোধমূলক চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
———
Mucosal vaccination in mice provides protection from diverse respiratory threat. Science (2026).
DOI: 10.1126/science.aea1260
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


