প্রায় ১০ লক্ষ বছরেরও বেশি সময় আগে বেঁচে থাকা প্রাচীন ম্যামথের (Mammuthus) হাড় ও দাঁতের বিশ্লেষণে গবেষকরা খুঁজে পেয়েছেন কিছু ক্ষুদ্র জীবাণুর অস্তিত্ব, যারা একসময় তাদের মুখগহ্বর ও শরীরে বসবাস করত।
২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ Cell জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাটি জানাচ্ছে, এটাই এখন পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া সবচেয়ে পুরোনো মাইক্রোবিয়াল ডিএনএ। এতে দেখা গেছে, আফ্রিকান হাতির (Loxodonta africana) মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত কিছু রোগজীবাণু একসময় তাদের প্রাচীন আত্মীয় ম্যামথদেরও সংক্রমিত করেছিল।
স্টকহোমের সেন্টার ফর প্যালিওজেনেটিক্স-এর প্যালিওমাইক্রোবায়োলজিস্ট বেনজামিন গুইনে বলেন, “এটা আসলে এক চমৎকার সুযোগ, যাতে বোঝা যায় বিলুপ্ত প্রাণীদের শরীরে কেমন ধরনের ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস বাস করত।” তিনি আরও মনে করেন, এসব জীবাণু হয়তো প্রাচীন প্রাণীদের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করেছে, কিংবা তাদের বিলুপ্তির পেছনেও ভূমিকা রেখেছে।
রোগজীবাণুর উপস্থিতি
এর আগে বেশিরভাগ গবেষণা ঘুরে দাঁড়াত মানুষ ও মানুষের শরীরসংক্রান্ত জীবাণুর ডিএনএ ঘিরে। কিন্তু প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী আর তাদের জীবাণুর মিথস্ক্রিয়া নিয়ে খুব কম কাজ হয়েছে।
গবেষকরা ৪৮৩টি ম্যামথের দাঁত, খুলি আর চামড়ার নমুনা থেকে মাইক্রোবিয়াল ডিএনএ বিশ্লেষণ করেছেন। এসব নমুনা উত্তর আমেরিকা, ব্রিটেন থেকে শুরু করে সাইবেরিয়া পর্যন্ত নানা জায়গা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। সময়কালও বিস্তৃত, প্রায় ১০ লক্ষ বছর আগে প্লাইস্টোসিন যুগ থেকে শুরু করে মাত্র ৪ হাজার বছর আগে হোলোসিনে সাইবেরিয়ার দূরবর্তী র্যাংল দ্বীপে বিলুপ্ত হওয়া শেষ ম্যামথ পর্যন্ত।
গবেষণায় মোট ৩১০ প্রজাতির জীবাণুর সন্ধান মেলে। তবে এদের অনেকেই ছিল মৃত্যুর পর শরীরে বসতি গড়া পরিবেশগত ব্যাকটেরিয়া। সেগুলো বাদ দিয়ে জীবিত অবস্থায় ম্যামথদের শরীরে থাকা জীবাণুগুলোতে মনোযোগ দেন গবেষকরা।
ক্রেডিট: Love Dalén
মেটাজেনোমিক স্ক্রিনিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব ডিএনএ সিকোয়েন্স করা হয় এবং আধুনিক জীবাণুর সঙ্গে তুলনা করে তাদের পরিচয় নির্ধারণ করা হয়।
ফলাফলে দেখা গেছে, অন্তত ছয়টি জীবাণু-গোষ্ঠী সরাসরি ম্যামথদের শরীরের সঙ্গে যুক্ত ছিল, যাদের মধ্যে কিছু রোগও সৃষ্টি করতে পারত। যেমন Actinobacillus, যা সাধারণত শূকরের মল থেকে পাওয়া গেছে এবং সম্ভবত ম্যামথের মুখের মাইক্রোবায়োমের অংশ ছিল। আরেকটি ব্যাকটেরিয়া Pasteurella, যা ২০২০ সালে বতসোয়ানা ও জিম্বাবুয়েতে বহু আফ্রিকান হাতির মৃত্যুর জন্য দায়ী জীবাণুর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। এটি হাতির মুখে সংক্রমণ ঘটিয়ে রক্তপ্রবাহে ছড়িয়ে গিয়ে সেপসিস সৃষ্টি করেছিল।
এছাড়া গবেষকরা Erysipelothrix নামের ব্যাকটেরিয়ার জিনোম পুনর্গঠন করেছেন চারটি উলি ম্যামথ এবং ১.১ মিলিয়ন বছরের পুরোনো এক স্টেপ ম্যামথের নমুনা থেকে। এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে পুরোনো হোস্ট-সম্পর্কিত মাইক্রোবিয়াল ডিএনএ। মজার বিষয়, অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া যেখানে মূলত দাঁতের কোষে পাওয়া গেছে, সেখানে এটি হাড়ের টিস্যুতেও শনাক্ত হয়েছে।
প্রাচীন মাইক্রোবায়োমের জানালা
এই জীবাণুগুলো ম্যামথদের স্বাস্থ্যের ওপর কতটা প্রভাব ফেলেছিল, শুধু জিনগত বিশ্লেষণ দিয়ে তা স্পষ্ট করা কঠিন। তবে গবেষকদের মতে, এটাই প্রাচীন প্রাণীদের মাইক্রোব নিয়ে প্রথম বিস্তৃত তথ্যভান্ডারের ঝলক।
প্যারিসের ইনস্টিটিউট জ্যাক মোনোর প্যালিওজেনেটিসিস্ট ইভা-মারিয়া গেইগল অবশ্য প্রশ্ন তুলেছেন যে, এত পুরোনো নমুনার বিশ্লেষণ কতটা জৈবিকভাবে প্রাসঙ্গিক, যেহেতু তুলনার মতো রেফারেন্স খুব সীমিত। তবে তিনি স্বীকার করেন, “তারা অবশ্যই ভালো কাজ করেছে এবং প্রচুর তথ্য দিয়েছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “এই গবেষণা প্রমাণ করে দিয়েছে, অত্যন্ত প্রাচীন ব্যাকটেরিয়ারও ডিএনএ উদ্ধার সম্ভব।”
গবেষকরা মনে করেন, এ আবিষ্কার ভবিষ্যতে প্রাচীন মাইক্রোবায়োম বোঝার নতুন দিগন্ত খুলে দেবে—যা থেকে জানা যেতে পারে প্রাণীদের স্বাস্থ্য, রোগ, এমনকি বিলুপ্তি সম্পর্কেও।
গুইনে বলেন, “এটা একদম গল্পের মতো। আমরা আসলে জীবনের বইটা খুলতে চাই এবং জ্ঞানের সীমানা আরও এগিয়ে নিতে চাই।”
———
Ancient host-associated microbes obtained from mammoth remains, Cell (2025)
DOI: 10.1016/j.cell.2025.08.003
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



