১২৪ আলোকবর্ষ দূরের গ্রহ K2-18b-তে প্রাণের অস্তিত্বের যে সম্ভাবনা নিয়ে বিজ্ঞানীরা আশাবাদী ছিলেন, তা এখন অনেকটাই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। নতুন পর্যবেক্ষণে এমন কোনও জৈব অণুর নিশ্চিত প্রমাণ মেলেনি, যার ইঙ্গিত আগের গবেষণায় পাওয়া গিয়েছিল। বেশিরভাগ বিজ্ঞানী একমত যে, আগের দাবি ছিল তাড়াহুড়োর ফল। তবে আগের গবেষণার অন্যতম প্রধান গবেষক দাবি করছেন, নতুন তথ্য বরং আগের চেয়েও জোরালো প্রমাণ দিচ্ছে।
এ বছর এপ্রিল মাসে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিক্কু মধুসূদন ও তাঁর সহকর্মীরা দাবি করেন, K2-18b গ্রহের বায়ুমণ্ডলে ডাইমিথাইল সালফাইড (DMS) ও ডাইমিথাইল ডিসালফাইড (DMDS) নামের দুটি অণুর ইঙ্গিত মিলেছে। পৃথিবীতে এই অণুগুলো কেবল জীবিত প্রাণীর মাধ্যমেই তৈরি হয়। তখন মধুসূদন বলেছিলেন, “এটাই প্রথম ইঙ্গিত, যে আমরা কোনও বসবাসযোগ্য এলিয়েন গ্রহকে খুঁজে পেতে চলেছি।”
কিন্তু পরে অন্যান্য গবেষকেরা জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST)-এর একই তথ্য ভিন্ন পরিসংখ্যানগত মডেল ব্যবহার করে বিশ্লেষণ করলে DMS বা DMDS-এর উপস্থিতির কোনও শক্ত প্রমাণ পাননি। যদিও মধুসূদনের দলও আরও ব্যাপকভাবে ওই তথ্য পুনঃবিশ্লেষণ করে এবং তিনি জানান, এতে তাঁর আত্মবিশ্বাস আরও বেড়েছে যে, DMS-ই হল তথ্যটির সবচেয়ে ভালো ব্যাখ্যা।
তবে সেই বিতর্কের অবসান ঘটাতে, এবার ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির রেনিউ হু ও তাঁর সহকর্মীরা মধুসূদনের সঙ্গে যৌথভাবে JWST-এর নতুন তথ্য বিশ্লেষণ করেন। তাঁদের মতে, “এই গবেষণাপত্রে DMS-এর উপস্থিতির কোনও পরিসংখ্যানগত প্রমাণ নেই।”
তাঁরা JWST-এর নিয়ার-ইনফ্রারেড ক্যামেরা দিয়ে K2-18b গ্রহের নক্ষত্রের আলো বিশ্লেষণ করেন, যা গ্রহটির বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে আসার ফলে অণুগুলোর উপস্থিতির ইঙ্গিত দিতে পারে। আগের বিশ্লেষণে মিড-ইনফ্রারেড আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য ব্যবহার করা হয়েছিল, এবার ব্যবহার হয়েছে ভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্য।
তাঁরা বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন সম্ভাব্য মডেল ব্যবহার করেন, কিছুতে DMS অন্তর্ভুক্ত ছিল, কিছুতে ছিল না। দেখা যায়, কিছু DMS-যুক্ত মডেল তথ্য ব্যাখ্যা করতে একটু ভালো করে, তবে সবক্ষেত্রে তা সত্য নয় এবং কোনও ক্ষেত্রেই DMS-এর উপস্থিতি প্রমাণ করার মতো শক্ত প্রমাণ মেলেনি।
রেনিউ হু বলেন, “এই মডেল-নির্ভরতাই দেখায় যে, সিগন্যালটি খুবই দুর্বল, যদি সত্যিই কোনো সিগন্যাল থেকে থাকে। তাই সাবধানতার সঙ্গে এগোনো উচিত।”
মধুসূদন স্বীকার করেছেন যে, এখনও নিশ্চিতভাবে DMS শনাক্ত হয়েছে বলা যাবে না। তবে তিনি যুক্তি দেন, এই নতুন তথ্য যদি ২০২৩ সালের একই ক্যামেরার তথ্যের সঙ্গে তুলনা করা হয় (এপ্রিলের মিড-ইনফ্রারেডের সঙ্গে নয়), তাহলে দেখা যায় যে, DMS-এর জন্য প্রমাণ একটু বেশি জোরালো। “খালি পরিসংখ্যানের কথা বললে, এই গবেষণাপত্রে আমরা যেটা প্রকাশ করছি, তা বলছে DMS-এর সম্ভাবনা কিছুটা বেশি,” বলেন মধুসূদন।
তবে তিনি এটাও বলেন, “DMS-এর মতো আচরণ করছে এমন আরও অণু থাকতে পারে। কিন্তু কোনও একটি অজানা অণু এই সংকেত তৈরি করছে, আর DMS-ই সেটার সেরা ব্যাখ্যা হতে পারে। যদিও আমরা এখনও নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছি না।”
অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির লুইস ওয়েলব্যাংকস বলেন, “এই গবেষণাপত্র একেবারে স্পষ্ট করে বলছে যে, DMS-এর কোনও পরিসংখ্যানগত প্রমাণ নেই।” এমআইটি’র সারা সিগারও একমত, বলছেন, “তারা যে পরিসংখ্যান দেখিয়েছে, তা যথেষ্ট নয় কোনো কিছু শনাক্ত করার জন্য।”
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যাক টেলর বলেন, “DMS শনাক্ত করা যায় কি না, এই বিতর্কের প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি, কারণ আরও নির্ভুল তথ্যও এর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারেনি।”
DMS-এর জৈব-চিহ্ন (biosignature) হিসেবে প্রস্তাবের আরেকটি ধাক্কা হল এই যে, হু ও তাঁর দল দেখিয়েছেন, K2-18b’র মতো কিছু হাইড্রোজেন-সমৃদ্ধ গ্রহের বায়ুমণ্ডলে DMS জীবনের উপস্থিতি ছাড়াও রাসায়নিকভাবে তৈরি হতে পারে। টেলর বলেন, “এটা আমাদের সাহায্য করছে নির্ধারণ করতে, কোন অণুগুলো আসলেই কেবল জীবনের প্রমাণ হতে পারে। DMS সেক্ষেত্রে বাদ পড়ছে।”
তবে তিনি এটাও বলেন যে, আবার মিড-ইনফ্রারেড যন্ত্রের সাহায্যে পরবর্তী অবজারভেশন করলে আরও নির্দিষ্ট সংকেত ধরা পড়তে পারে, যেখানে DMS ও অন্যান্য জটিল অণুর উপস্থিতি শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
সবশেষে, একটি বিষয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা একমত: K2-18b গ্রহটি পানিতে সমৃদ্ধ। হু এবং তাঁর সহকর্মীরা মিথেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের উপস্থিতির শক্ত প্রমাণ পেয়েছেন, যা পানির উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। তবে এই পানি গ্রহের বায়ুমণ্ডলে আছে, মহাসাগর হিসেবে আছে, না কি ভেতরে আটকে আছে—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
————
A water-rich interior in the temperate sub-Neptune K2-18 b revealed by JWST, arXiv (2025).
DOI: 10.48550/arXiv.2507.12622
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


