চীনের সিচুয়ান প্রদেশেবায়ান ওবো মাইনিং কমপ্লেক্সে সম্প্রতি ১ মিলিয়ন টন প্রাকৃতিক থোরিয়াম (Th-232) এর মজুদ আবিষ্কৃত হয়েছে। গবেষকদের দাবি, এই পরিমাণ থোরিয়াম চীনের বিদ্যুতের চাহিদা আগামী ৬০ হাজার বছর পর্যন্ত মেটাতে সক্ষম হবে। যদিও এটি একটি প্রাথমিক অনুমান, তবুও এই আবিষ্কার থোরিয়াম-ভিত্তিক জ্বালানির সম্ভাবনাকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। আর নতুন এই আবিষ্কার চীনের পূর্বঘোষিত আনুমানিক ১ মিলিয়ন টনের প্রমাণিত রিজার্ভকে কয়েক গুণ ছাড়িয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
থোরিয়াম কী?
থোরিয়াম (Thorium, সংকেত Th) একটি প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান তেজস্ক্রিয় মৌল, যেটি পারমাণবিক জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়ামের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা রাখে। প্রকৃতিতে এটি মূলত Th-232 আইসোটোপ আকারে পাওয়া যায়, যা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নিউট্রন শোষণ করে ইউরেনিয়াম-২৩৩ তে রূপান্তরিত হতে পারে। ইউরেনিয়াম-২৩৩ একটি কার্যকর জ্বালানি উপাদান।
থোরিয়ামের অন্যতম বড় সুবিধা হলো, এটি পৃথিবীতে ইউরেনিয়ামের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়। এছাড়া, এর ব্যবহারে তুলনামূলকভাবে কম পারমাণবিক বর্জ্য উৎপন্ন হয় এবং এটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য তেমন উপযোগী নয়, ফলে এটি নিরাপদ বলেই ধরা হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বর্তমানে মোল্টেন সল্ট রিঅ্যাক্টর (MSR) প্রযুক্তির মাধ্যমে থোরিয়াম-ভিত্তিক জ্বালানি ব্যবহারের ওপর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি টেকসই, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব (গ্রিন/ক্লিন) শক্তির উৎস হিসেবে সম্ভাবনাময় বলে বিবেচিত হচ্ছে।
থোরিয়ামের সুবিধা
প্রকৃতিতে প্রাপ্ত থোরিয়াম একটি তেজস্ক্রিয় মৌল হলেও এর তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা ইউরেনিয়ামের তুলনায় অনেকটাই কম। বিজ্ঞানীরা এটিকে পরিবেশবান্ধব, ঝুঁকিমুক্ত ও নিরাপদ বলে মনে করেন। তবে এটি সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহারযোগ্য না হলেও Molten Salt Reactor (MSR)-এর মতো প্রযুক্তির মাধ্যমে নিউট্রন শোষণ করে এটিকে ইউরেনিয়াম-২৩৩-এ রূপান্তরিত করে কার্যকরী জ্বালানি উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।
এই বিশেষ প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে থোরিয়াম যথেষ্ট কম তেজষ্ক্রিয় বর্জ্য উৎপন্ন করে এবং পারমাণবিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই হ্রাস করবে মনে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। এই প্রযুক্তি নিয়ে আমেরিকা, চীন এবং ভারতের মতো দেশ নিবিড়ভাবে গবেষণা ও উন্নয়ন চালিয়ে গেলেও তা এখনো পর্যন্ত পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে।
বৈশ্বিক থোরিয়াম মজুদ
বর্তমানে বিশ্বের প্রমাণিত বৃহত্তম থোরিয়াম মজুদ রয়েছে ভারতে (প্রায় ৮.৪৬ লক্ষ মেট্রিক টন)। ভারতের পাশাপাশি ব্রাজিল (৬.৩ লক্ষ টন), অস্ট্রেলিয়া (৫.৯ লক্ষ টন) এবং যুক্তরাষ্ট্র (৪০ হাজার টন) থোরিয়াম মজুত থাকতে পারে। তবে চীনের এই নতুন আবিষ্কৃত প্রায় ১ মিলিয়ন টন থোরিয়ামের মজুত বৈশ্বিক পর্যায়ে দেশটির অবস্থানকে হয়ত আরো শক্তিশালী করবে।
নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা
বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন যে, সীমিত পর্যায়ের তেজস্ক্রিয় থোরিয়াম উপাদান থেকে সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা যায় না, তাই এটিকে ‘নন-প্রোলিফারেশন’ জ্বালানি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে থোরিয়ামের বাণিজ্যিক ব্যবহার একেবারেই সীমিত হলেও গবেষণার জন্য বিশুদ্ধ থোরিয়াম অক্সাইড (ThO₂) আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি কেজি ৩,০০০ থেকে ১০,০০০ ডলারে বিক্রি হতে পারে।
থোরিয়াম প্রযুক্তিতে চীনের অগ্রগতি
বর্তমানে থোরিয়াম ভিত্তিক জ্বালানি গবেষণায় বৈশ্বিক পর্যায়ে নেতৃত্বের আসনে রয়েছে চীন। দেশটি মূলত লিকুইড ফ্লোরাইড থোরিয়াম রিঅ্যাক্টর (LFTR) প্রযুক্তির উন্নয়নে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। গত ২০২১ সালে গোবি মরুভূমিতে একটি পরীক্ষামূলক উচ্চ প্রযুক্তির Molten Salt Reactor (MSR) সিস্টেম চালু করে। যা self-regulating system হিসেবে কাজ করে এবং core meltdown বা নিউক্লিয়ার বিস্ফোরণের ঝুঁকি কম বলে দাবি করা হয়।
থোরিয়াম গবেষণায় ভারতের যাত্রা
বৈশ্বিক পর্যায়ে থোরিয়াম মৌল মজুতের দিক দিয়ে ভারত থেরিয়াম সুপারপাওয়ার হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে। বিশেষ করে ভারতের কেরালা রাজ্যে এই উপাদানের বিশাল মজুদ রয়েছে। দেশটি তার Advanced Heavy Water Reactor (AHWR) প্রযুক্তি নিয়ে নিবিড়ভাবে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। যা অদূর ভবিষ্যতে থোরিয়াম ভিত্তিক জ্বালানি শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পরিবেশগত সুবিধা
বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, সীমিত পর্যায়ের তেজস্ক্রিয় থোরিয়াম ভিত্তিক জ্বালানি কার্বন নিঃসরণ কমাতে সাহায্য করবে এবং ভবিষ্যতে ঝুঁকিমুক্ত ও টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। আগামী ২০৬০ সালের মধ্যে নেট-জিরো কার্বন নিঃসরণ অর্জনের লক্ষ্যে এবং টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চীন এই প্রযুক্তি উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা মাফিক এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
এই গবেষণায় চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ!
যদিও এখনো পর্যন্ত থোরিয়াম প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা পরীক্ষামূলক স্তরে রয়েছে। এটি ভবিষ্যতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি চাহিদা পূরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে প্রত্যাশা করেন বিজ্ঞানীরা। তবে যাই হোক না কেন, এর ব্যাপক উন্নয়ন ও গবেষণা এবং বাণিজ্যিক উৎপাদন অবশ্যই আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিরাপত্তা নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। তার পাশাপাশি এই অভাবনীয় ও অতি সম্ভাবনাময় জ্বালানির উৎস যাতে সারা বিশ্বের মানব কল্যাণে ব্যবহার হয় তা সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায় যে, থোরিয়াম ভিত্তিক জ্বালানি ব্যবস্থা এখন কেবল আর গবেষণার বিষয় নয়, এটি ভবিষ্যতের ক্লিন এনার্জি-এর একটি শক্তিশালী এবং সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। চীনের মতো দেশগুলোর উদ্যোগ এবং ইনোভেটিভ আইডিয়া এই খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে, যা অদূর ভবিষ্যতে হয়ত সারা বিশ্বে নিরাপদ জ্বালানি ব্যবস্থার এক নতুন বিপ্লব সূচনা করতে পারে।
তথ্যসূত্র:
- World Nuclear Association, “Thorium”, 2 May 2024
- IAEA, “Thorium Fuel Cycle – Potential Benefits and Challenges” IAEA-TECDOC-1450|92-0-103405-9|112 pages|2005
- IAEA, “Thorium’s Long-Term Potential in Nuclear Energy: New IAEA Analysis“, 13 March 2023
- South China Morning Post, “China’s thorium survey finds ‘endless energy source right under our feet’”, February 2025
- Discovery Alert, “China’s Breakthrough: Thorium Discovery Promises 60,000 Years of Clean Energy“, 3 March, 2025
- IEEE Spectrum, “Why China Is Building a Thorium Molten-Salt Reactor?” 30 December, 2014
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


