শরীরের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেমকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়, নইলে সেটি আমাদের নিজস্ব অঙ্গপ্রত্যঙ্গকেই আক্রমণ করতে পারে। এই কারণেই ২০২৫ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞান অর্থাৎ ফিজিওলজি বা মেডিসিনে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে মেরি ই. ব্রাংকো (Mary E. Brunkow), ফ্রেড র্যামসডেল (Fred Ramsdell) এবং শিমোন সাকাগুচি (Shimon Sakaguchi)-কে। তাঁরা “পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স” নিয়ে যুগান্তকারী আবিষ্কার করেছেন যা আমাদের দেহকে নিজস্ব ইমিউন সিস্টেমের ক্ষতিকর আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। তাঁদের কাজ নতুন এক গবেষণা ক্ষেত্রের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে এবং ক্যান্সার ও অটোইমিউন রোগের মতো জটিল অসুখের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
ব্রেকিং নিউজ!
২০২৫ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয় মেরি ই. ব্রানকো (Mary E. Brunkow), ফ্রেড র্যামসডেল (Fred Ramsdell) এবং শিমোন সাকাগুচি (Shimon Sakaguchi)-কে তাদের “পরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স বিষয়ক তাঁদের আবিষ্কারের জন্য।”#NobelPrize pic.twitter.com/EXSkOAvde3
— বিজ্ঞানবার্তা – BigganBarta (@bigganbarta) October 6, 2025
ইমিউন সিস্টেম আসলেই বিবর্তনের এক অনন্য সৃষ্টি। প্রতিদিন এটি আমাদের শরীরকে হাজারো ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া আর অন্যান্য জীবাণুর আক্রমণ থেকে বাঁচিয়ে রাখে। কার্যকর ইমিউন সিস্টেম ছাড়া আমাদের বেঁচে থাকা সম্ভব হতো না।
এই ব্যবস্থার অন্যতম বিস্ময় হলো, এটি শরীরে প্রবেশ করা জীবাণুগুলোকে চিনে ফেলে এবং সেগুলোকে দেহের নিজস্ব কোষ থেকে আলাদা করে। আশ্চর্যের বিষয়, জীবাণুগুলো কোনো নির্দিষ্ট “ইউনিফর্ম” পরে আসে না; প্রত্যেকের চেহারা ভিন্ন। অনেক জীবাণু আবার মানুষের কোষের মতো ছদ্মবেশ ধারণ করে ফেলে। তাহলে প্রশ্ন হলো, ইমিউন সিস্টেম কীভাবে ঠিক করে কোনটিকে আক্রমণ করতে হবে আর কোনটিকে রক্ষা করতে হবে? কেন আমাদের ইমিউন সিস্টেম নিজের শরীরকে ঘন ঘন আক্রমণ করে না?
গবেষকরা অনেকদিন ধরে ভেবেছিলেন এই প্রশ্নের উত্তর জানা আছে। তাঁদের মতে, ইমিউন কোষ এক ধরনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিপক্ব হয়, যাকে বলা হয় “সেন্ট্রাল ইমিউন টলারেন্স”। কিন্তু পরে দেখা গেল, ইমিউন সিস্টেম আসলে আরও জটিল। আর এই জটিলতাকেই উন্মোচন করেছেন মেরি ব্রাংকো, ফ্রেড র্যামসডেল ও শিমন সাকাগুচি। তাঁরা আবিষ্কার করেন যে “রেগুলেটরি টি সেল” নামের বিশেষ কোষ আসলে ইমিউন সিস্টেমের নিরাপত্তারক্ষীর মতো কাজ করে। তাঁদের এই আবিষ্কার নতুন গবেষণাক্ষেত্রের ভিত্তি গড়ে তোলে। বর্তমানে বেশ কিছু সম্ভাবনাময় চিকিৎসা পদ্ধতি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে পরীক্ষা করা হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, এগুলো দিয়ে অটোইমিউন রোগ নিরাময় করা, ক্যান্সারের আরও কার্যকর চিকিৎসা দেওয়া, এমনকি স্টেম সেল প্রতিস্থাপনের জটিলতা প্রতিরোধ করাও সম্ভব হবে।
এখন চলুন ২০২৫ সালের ফিজিওলজি বা মেডিসিনে নোবেল পুরস্কারের গল্প শুরু করি। তার আগে, ১৯৯০-এর দশকে গবেষকেরা ইমিউন সিস্টেমের টি সেল সম্পর্কে কী জানতেন তা জানি। এই টি সেলগুলোই আমাদের গল্পের কেন্দ্রবিন্দু—কারণ এরা আমাদের শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রক্ষক।
টি সেল (T cell) – শরীরের প্রতিরক্ষার মূল খেলোয়াড়
হেল্পার টি সেল (Helper T cell) সবসময় শরীর টহল দেয়। কোনো জীবাণুর উপস্থিতি টের পেলেই অন্য ইমিউন কোষকে সতর্ক করে, আর তখন পুরো ইমিউন বাহিনী আক্রমণে নামে।
কিলার টি সেল (Killer T cell) ভাইরাস বা অন্যান্য জীবাণুতে আক্রান্ত কোষগুলো ধ্বংস করে ফেলে। এরা এমনকি টিউমার কোষকেও আক্রমণ করতে সক্ষম।
এইগুলোর বাইরে আরও নানা ধরনের ইমিউন কোষ আছে, যাদের কাজ আলাদা আলাদা। তবে এই গল্পে আমরা সেসব নিয়ে বিস্তারিত বলব না, কারণ এখানে মূল ভূমিকায় রয়েছে টি সেল।
সব টি সেলের গায়ে বিশেষ একধরনের প্রোটিন থাকে, যেগুলোকে বলা হয় টি-সেল রিসেপ্টর। এগুলো আসলে সেন্সরের মতো কাজ করে। এই রিসেপ্টরের সাহায্যে টি সেল শরীরের অন্য কোষ পরীক্ষা করে দেখে দেহে কোনো আক্রমণ চলছে কি না। টি-সেল রিসেপ্টরগুলো বিশেষ এজন্য যে, পাজলের টুকরোর মতো প্রতিটির আকার আলাদা। এগুলো তৈরি হয় অনেকগুলো জিনের এলোমেলো সমন্বয়ে। তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের শরীর দশ লক্ষ কোটি কোটি (10¹⁵ অর্থাৎ ১ এর পরে ১৫ টা শূন্য) এরও বেশি ভিন্ন ধরনের টি-সেল রিসেপ্টর তৈরি করতে পারে।
ক্রেডিট: Mattias Karlén/The Nobel Committee for Physiology or Medicine
এত বিপুল সংখ্যক ভিন্ন রিসেপ্টরের কারণে প্রায় সবসময়ই কিছু না কিছু টি সেল থাকে, যারা নতুন কোনো জীবাণুর গঠন চিনে ফেলতে পারে। এর মধ্যে নতুন ভাইরাসও থাকতে পারে, যেমন ২০১৯ সালে শুরু হওয়া কোভিড-১৯ মহামারি। তবে সমস্যাটা হলো, শরীরের তৈরি কিছু টি-সেল রিসেপ্টর আবার আমাদের নিজেদের টিস্যুর অংশের সাথেও আটকে যেতে পারে। তাহলে প্রশ্ন হলো, কীভাবে টি সেল বুঝে নেয় কোনটা শত্রু জীবাণু আর কোনটা নিজের শরীরের কোষ?
১৯৮০-এর দশকে গবেষকেরা আবিষ্কার করেন যে, টি সেল যখন থাইমাস গ্রন্থিতে পরিপক্ব হয়, তখন ওদের একটি পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। যেসব টি সেল শরীরের নিজের প্রোটিন (এন্ডোজেনাস প্রোটিন) চিনে ফেলে, সেগুলো ধ্বংস হয়ে যায়। এই বাছাই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় সেন্ট্রাল টলারেন্স।
ক্রেডিট: Mattias Karlén/The Nobel Committee for Physiology or Medicine
এছাড়া কিছু গবেষক ধারণা করেছিলেন, একটি বিশেষ কোষ আছে যাকে তাঁরা সাপ্রেসর টি সেল বলতেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, থাইমাসের পরীক্ষায় যারা ফসকে যায়, সেগুলোকে এই সাপ্রেসর টি সেল নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু সমস্যা হলো কিছু গবেষক তাঁদের পরীক্ষার ফল থেকে অযৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছান। পরে যখন বোঝা গেল এই সাপ্রেসর টি সেলের পক্ষে থাকা প্রমাণগুলোর কিছু আসলে ভুল ছিল, তখন পুরো ধারণাটাকেই বাতিল করে দেওয়া হয়। ফলস্বরূপ এই গবেষণা ক্ষেত্র কার্যত পরিত্যক্ত হয়ে যায়।
তবে একজন বিজ্ঞানী স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ালেন। তিনি হলেন শিমন সাকাগুচি, যিনি জাপানের নাগোইয়া শহরের আইচি ক্যান্সার সেন্টার রিসার্চ ইনস্টিটিউটে কাজ করতেন।
সাকাগুচির প্রেরণা আসে তাঁর সহকর্মীদের একটি পুরোনো ও পরস্পরবিরোধী পরীক্ষার ফলাফল থেকে। তাঁরা টি সেলের বিকাশে থাইমাস গ্রন্থির ভূমিকা বুঝতে নবজাতক ইঁদুরের শরীর থেকে থাইমাস অপসারণ করেন। তাঁদের ধারণা ছিল, এতে ইঁদুরের কম টি সেল তৈরি হবে এবং ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে যাবে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, যদি জন্মের তিন দিন পর ইঁদুরের থাইমাস কেটে ফেলা হয়, তখন ইমিউন সিস্টেম অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে পড়ে এবং নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায়। এর ফলে ইঁদুরগুলো নানা ধরনের অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত হয়।
এ বিষয়টি আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য, ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে শিমন সাকাগুচি জেনেটিকভাবে অভিন্ন ইঁদুর থেকে পরিপক্ব টি সেল আলাদা করেন এবং সেগুলো থাইমাসবিহীন ইঁদুরে প্রতিস্থাপন করেন। এর একটি আকর্ষণীয় ফল দেখা গেল: কিছু টি সেল যেন ইঁদুরগুলোকে অটোইমিউন রোগ থেকে রক্ষা করতে পারছে।
ক্রেডিট: Mattias Karlén/The Nobel Committee for Physiology or Medicine
এই ফলাফলসহ আরও কয়েকটি পরীক্ষার পর সাকাগুচি নিশ্চিত হলেন যে ইমিউন সিস্টেমের ভেতরে নিশ্চয়ই এক ধরনের নিরাপত্তারক্ষী কোষ আছে যা অন্য টি সেলকে শান্ত রাখে এবং নিয়ন্ত্রণে রাখে। কিন্তু এই কোষটি আসলে কোন ধরনের?
গবেষকেরা সাধারণত টি সেলকে আলাদা করেন কোষের গায়ে থাকা প্রোটিন দেখে। উদাহরণস্বরূপ, হেল্পার টি সেল চিহ্নিত করা যায় CD4 নামের প্রোটিন দ্বারা আবার কিলার টি সেল আলাদা হয় CD8 প্রোটিন দিয়ে।
যে পরীক্ষায় সাকাগুচি ইঁদুরকে অটোইমিউন রোগ থেকে রক্ষা করেছিলেন, সেখানে তিনি ব্যবহার করেছিলেন CD4 বহনকারী কোষ অর্থাৎ হেল্পার টি সেল। সাধারণত এই কোষগুলো ইমিউন সিস্টেমকে জাগিয়ে তোলে এবং সক্রিয় করে। কিন্তু তাঁর পরীক্ষায় দেখা গেল উল্টো, ইমিউন সিস্টেম নিয়ন্ত্রিত হয়ে যাচ্ছে। এর মানে দাঁড়ালো, CD4 বহনকারী টি সেলেরও আলাদা আলাদা ধরন থাকতে পারে।
নিজের ধারণা পরীক্ষা করার জন্য সাকাগুচিকে বিভিন্ন ধরনের টি সেলকে আলাদা করার উপায় বের করতে হলো। এর জন্য তাঁর প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় লেগে যায়। অবশেষে ১৯৯৫ সালে তিনি একেবারে নতুন এক শ্রেণির টি সেলের সন্ধান দেন। The Journal of Immunology-তে প্রকাশিত তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, এই নতুন টি সেলগুলো (যারা ইমিউন সিস্টেমকে শান্ত রাখে)-র বৈশিষ্ট্য হলো গায়ে শুধু CD4 নয়, বরং আরেকটি প্রোটিন CD25-ও থাকে।
ক্রেডিট: Mattias Karlén/The Nobel Committee for Physiology or Medicine
এই নতুন আবিষ্কৃত শ্রেণিকে নাম দেওয়া হলো রেগুলেটরি টি সেল (regulatory T cell)। তবে অনেক গবেষক শুরুতে এর অস্তিত্ব নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। তাঁরা বললেন, আরও প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত এ আবিষ্কার মানা কঠিন। আর এই গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ আসে মেরি ব্রাংকো ও ফ্রেড র্যামসডেল এর কাছ থেকে।
এবার শুরু হলো ২০২৫ সালের ফিজিওলজি বা মেডিসিনের নোবেল পুরস্কারের দ্বিতীয় অধ্যায়। আর এর সূচনা হয় যুক্তরাষ্ট্রের একটি ল্যাবরেটরিতে, ১৯৪০-এর দশকে জন্ম নেওয়া কিছু অসুস্থ পুরুষ ইঁদুরের মাধ্যমে।
টেনেসির ওক রিজ শহরের এই ল্যাবরেটরিতে গবেষকেরা বিকিরণের (radiation) প্রভাব নিয়ে কাজ করছিলেন। তাঁদের কাজ ছিল ম্যানহাটন প্রজেক্ট ও পরমাণু বোমা তৈরির গবেষণার অংশ। কিন্তু ঘটনাচক্রে এক বিশেষ ইঁদুর প্রজাতি জন্ম নেয়, যা পরবর্তীতে এই বছরের নোবেল পুরস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিছু পুরুষ ইঁদুর জন্ম নিল খসখসে ও খোলসের মতো চামড়া, অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে যাওয়া প্লীহা (spleen) এবং লিম্ফ গ্রন্থি নিয়ে। এরা বাঁচত মাত্র কয়েক সপ্তাহ।
এই বিশেষ ইঁদুর প্রজাতির নাম দেওয়া হলো স্কারফি (scurfy)। গবেষকদের নজর কাড়ল দ্রুতই। তখনও মলিকিউলার জেনেটিক্স প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল, কিন্তু তাঁরা বুঝতে পারলেন এই রোগ সৃষ্টিকারী মিউটেশনটি নিশ্চয়ই ইঁদুরের X ক্রোমোজোমে রয়েছে। এর প্রমাণও পাওয়া গেল: প্রায় অর্ধেক পুরুষ ইঁদুর আক্রান্ত, কিন্তু স্ত্রী ইঁদুর বেঁচে আছে কারণ তাদের দুইটি X ক্রোমোজোম থাকে অর্থাৎ একটিতে যদি মিউটেশন থাকে, অন্যটিতে থাকে সুস্থ ডিএনএ। তাই স্ত্রী ইঁদুরগুলো পরবর্তী প্রজন্মে এই স্কারফি মিউটেশন বহন করে যেতে থাকে।
১৯৯০-এর দশকে, যখন মলিকিউলার গবেষণার সরঞ্জাম আরও উন্নত হয়ে উঠল, গবেষকেরা খুঁজে দেখতে শুরু করলেন কেন পুরুষ স্কারফি ইঁদুর এত অসুস্থ হয়ে পড়ে। দেখা গেল, তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আক্রান্ত হচ্ছে নিজস্ব টি সেলের আক্রমণে, যা টিস্যু ধ্বংস করে দিচ্ছে। অর্থাৎ স্কারফি মিউটেশন কোনোভাবে ইমিউন সিস্টেমে বিদ্রোহ সৃষ্টি করছে।
এই স্কারফি মিউটেশন নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন দুই বিজ্ঞানী, মেরি ব্রাংকো ও ফ্রেড র্যামসডেল। তাঁরা কাজ করছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের বোথেল শহরের সেলটেক কাইরোসায়েন্স নামের একটি বায়োটেক কোম্পানিতে। প্রতিষ্ঠানটি অটোইমিউন রোগের ওষুধ তৈরি করত, আর ব্রাংকো ও র্যামসডেল বুঝলেন যে স্কারফি ইঁদুর তাঁদের গবেষণায় মূল্যবান সূত্র দিতে পারে। যদি তাঁরা বুঝতে পারেন কীভাবে এই মিউটেশন কাজ করছে, তবে অটোইমিউন রোগের উৎপত্তি সম্পর্কেও বড় ধরনের অগ্রগতি হবে। তাই তাঁরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলেন, স্কারফি ইঁদুরের মিউট্যান্ট জিনটি তারা খুঁজে বের করবেন।
আজকের দিনে একটি ইঁদুরের পুরো জিনোম মানচিত্র তৈরি করে মিউট্যান্ট জিন খুঁজে বের করা কয়েক দিনের কাজ। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকে সেটি ছিল যেন খড়ের গাদায় সুচ খোঁজার মতো। ইঁদুরের X ক্রোমোজোমের ডিএনএ শৃঙ্খল প্রায় ১৭০ মিলিয়ন নিউক্লিওটাইড দিয়ে তৈরি। এর ভেতর থেকে একটি মিউটেশন খুঁজে বের করা সম্ভব হলেও এর জন্য দরকার ছিল সময়, ধৈর্য আর সেই সময়কার সীমিত মলিকিউলার বায়োলজির টুলগুলোর সৃজনশীল ব্যবহার।
তাদের গবেষণায় দেখা গেল, স্কারফি মিউটেশন অবশ্যই X ক্রোমোজোমের মাঝামাঝি কোথাও রয়েছে। ব্রাংকো ও র্যামসডেল একে সংকুচিত করে আনলেন প্রায় ৫ লক্ষ নিউক্লিওটাইডের একটি অঞ্চলে। এরপর শুরু হলো বিশাল কাজ, X ক্রোমোজোমের ওই নির্দিষ্ট অংশকে বিস্তারিতভাবে ম্যাপিং করা।
এই কাজটি শেষ করতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল। ব্রাংকো ও র্যামসডেল কাজ শেষ করার পর দেখলেন যে নির্ধারিত এলাকায় প্রায় ২০টি সম্ভাব্য জিন আছে। তাদের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ ছিল সুস্থ ইঁদুর ও স্কার্ফি ইঁদুরের এই জিনগুলো তুলনা করা। একের পর এক জিন পরীক্ষা করতে থাকলেন তারা। অবশেষে বিশতম অর্থাৎ শেষ জিন পরীক্ষা করার পর তারা বিজয়ের চিৎকার দিতে পারলেন, বহু বছরের শ্রম শেষে তারা স্কার্ফি মিউটেশন খুঁজে পেলেন।
ক্রেডিট: Mattias Karlén/The Nobel Committee for Physiology or Medicine
ত্রুটিপূর্ণ জিনটি আগে কখনো চিহ্নিত হয়নি, তবে এটি ফর্কহেড বক্স বা FOX নামের জিনগোষ্ঠীর সঙ্গে বেশ মিল ছিল। এই গোষ্ঠীর কাজ হলো অন্য জিনের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করা, যা কোষের বিকাশকে প্রভাবিত করে। মেরি ব্রাংকো ও ফ্রেড র্যামসডেল নতুন জিনটির নাম দিলেন Foxp3।
এই গবেষণার সময় ব্রাংকো ও র্যামসডেল সন্দেহ করতে শুরু করেন যে বিরল এক অটোইমিউন রোগ IPEX, যা এক্স ক্রোমোজোমের সঙ্গেও যুক্ত, হয়তো স্কার্ফি ইঁদুরের রোগের মানব সংস্করণ। নতুন জিনগুলোর তথ্যভাণ্ডারে খুঁজতে গিয়ে তারা Foxp3–এর মানুষের সমতুল্য জিন খুঁজে পান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিশু বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় তারা IPEX-এ আক্রান্ত ছেলেদের নমুনা সংগ্রহ করেন। এসব নমুনা ম্যাপ করার পর সত্যিই তারা FOXP3 জিনে ক্ষতিকর মিউটেশন খুঁজে পান।
২০০১ সালে Nature Genetics–এ প্রকাশিত গবেষণায় মেরি ব্রাংকো ও ফ্রেড র্যামসডেল দেখান যে FOXP3 জিনে মিউটেশনই মানুষের IPEX রোগ এবং স্কার্ফি ইঁদুরের অসুস্থতার কারণ। এই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার বিশ্বব্যাপী গবেষণাগারে ব্যাপক উৎসাহ তৈরি করে। ধাপে ধাপে তথ্যগুলো একত্র করার পর গবেষকেরা বুঝতে পারেন যে FOXP3 জিন আসলে সাকাগুচি আবিষ্কৃত রেগুলেটরি টি সেলগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দুই বছর পর শিমন সাকাগুচি (এবং শিগগিরই আরও অনেক গবেষক) সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে FOXP3 জিন আসলে রেগুলেটরি টি সেলের বিকাশ নিয়ন্ত্রণ করে। এই কোষগুলো নিশ্চিত করে যে অন্য টি সেল ভুল করে শরীরের নিজের টিস্যুকে আক্রমণ না করে। এটাই হলো পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স নামক প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তি। এছাড়া, রেগুলেটরি টি সেল অনুপ্রবেশকারী জীবাণু ধ্বংস হয়ে গেলে ইমিউন সিস্টেমকে শান্ত করতেও ভূমিকা রাখে, যাতে এটি অবিরাম সর্বোচ্চ গতিতে কাজ চালিয়ে না যায়।
ক্রেডিট: Mattias Karlén/The Nobel Committee for Physiology or Medicine
রেগুলেটরি টি সেল আবিষ্কার এবং পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্সে তাদের ভূমিকা সম্পর্কিত মৌলিক জ্ঞান নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবনে গবেষকদের উৎসাহিত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, টিউমার ম্যাপিং থেকে দেখা গেছে টিউমারগুলো নিজেদের চারপাশে প্রচুর রেগুলেটরি টি সেল জমায়, যা টিউমারকে ইমিউন সিস্টেমের হাত থেকে রক্ষা করে। তাই গবেষকেরা চেষ্টা করছেন এই রেগুলেটরি টি সেলের প্রাচীর ভেঙে ফেলার উপায় খুঁজে বের করতে, যাতে ইমিউন সিস্টেম সরাসরি টিউমারে আক্রমণ করতে পারে।
অন্যদিকে, অটোইমিউন রোগের ক্ষেত্রে গবেষকেরা উল্টো কৌশল নিচ্ছেন অর্থাৎ আরও বেশি রেগুলেটরি টি সেল গঠনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। কিছু প্রাথমিক গবেষণায় রোগীদের দেওয়া হচ্ছে ইন্টারলিউকিন-২, যা রেগুলেটরি টি সেলের বৃদ্ধি ঘটায়। গবেষকেরা এ-ও খতিয়ে দেখছেন যে, ইন্টারলিউকিন-২ কি অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পর অঙ্গ প্রত্যাখ্যান প্রতিরোধে ব্যবহার করা সম্ভব কি না।
আরেকটি কৌশল হলো অতিরিক্ত সক্রিয় ইমিউন সিস্টেমকে ধীর করতে রোগীর শরীর থেকে রেগুলেটরি টি সেল আলাদা করে ল্যাবরেটরিতে সংখ্যা বাড়ানো। পরে সেগুলো আবার রোগীর শরীরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, ফলে রোগীর দেহে আরও বেশি রেগুলেটরি টি সেল থাকে। কিছু ক্ষেত্রে গবেষকেরা এই টি সেলগুলোকে পরিবর্তিত করেন, এবং তাদের গায়ে বিশেষ অ্যান্টিবডি বসান যা ঠিকানার লেবেলের মতো কাজ করে। এতে গবেষকেরা কোষগুলোকে নির্দিষ্ট অঙ্গের দিকে পাঠাতে পারেন, যেমন প্রতিস্থাপিত লিভার বা কিডনি, যাতে অঙ্গটি ইমিউন সিস্টেমের আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকে।
রোগ প্রতিরোধে রেগুলেটরি টি সেলকে কাজে লাগানোর আরও বহু পরীক্ষা চলছে। তাঁদের যুগান্তকারী আবিষ্কারের মাধ্যমে মেরি ব্রাংকো, ফ্রেড র্যামসডেল ও শিমন সাকাগুচি ইমিউন সিস্টেম কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখে সেই বিষয়ে মৌলিক জ্ঞান দিয়েছেন। আর এর মাধ্যমে তাঁরা মানবজাতির সর্বোচ্চ কল্যাণ সাধন করেছেন।
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।








