আজকের দিনে সোশ্যাল মিডিয়া শুধু সময় কাটানোর একটা মাধ্যম না বরং এটা এখনকার টিনএজারদের জীবনের একটা বিরাট অংশ। ১৫ থেকে ২০ বছর বয়সি ছেলেমেয়েদের মধ্যে, সোশ্যাল মিডিয়া হয়ে উঠেছে একদিকে দরকারি একটা টুল, আর অন্যদিকে একটা ফাঁদ। Journal of Advanced Zoology জার্নালে প্রকাশিত এক জরিপভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, সোশ্যাল মিডিয়া কীভাবে টিনএজারদের মানসিক আর শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর ভালো-মন্দ দুইভাবেই প্রভাব ফেলছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা যত বেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে, তাদের মধ্যে ঘুমের সমস্যা, মানষিক চাপ অনুভব করা, আর মনোযোগ হারানোর মতো সমস্যা বেশি দেখা যায়। জরিপে অংশ নেওয়া ৭৫% ছেলেমেয়ে বলেছে, সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে তাদের ঘুমের রুটিন বদলে গেছে। ৫৪.৫% বলেছে, সোশ্যাল মিডিয়া তাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা তৈরি করছে। আর সবচেয়ে চিন্তার ব্যাপার হলো, ৭২.৭% জানিয়েছে, তারা সাইবারবুলিংয়ের শিকার হয়েছে প্রতিনিয়ত।
তার চেয়েও ভয়াবহ, ৯০.৯% মনে করে সোশ্যাল মিডিয়া শরীর নিয়ে খারাপ ধারণা তৈরি করে, যেখানে সবাই পারফেক্ট হতে চায়। ৬৩.৬% ছেলে-মেয়ে বলেছে, তারা অনলাইনে দেখানো স্ট্যান্ডার্ডগুলোর সঙ্গে মেলাতে না পারার কারণে মানষিক চাপ অনুভব করে। এই একই সংখ্যক মানুষ বলেছে, সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে এত ব্যস্ত থাকে যে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া বা শরীরচর্চাও হয় না। সব মিলিয়ে, ৮১.৮% ছেলেমেয়ে বিশ্বাস করে, সোশ্যাল মিডিয়া তাদের মানসিক আর শারীরিক স্বাস্থ্যে খারাপ প্রভাব ফেলছে।
এইসব মিলিয়ে অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, এখনকার ছেলেমেয়েরা একধরনের “স্ক্রল-জম্বি সিনড্রোম”-এ ভুগছে। অর্থাৎ এতটাই স্ক্রিনে ডুবে থাকে যে চারপাশের বাস্তব জগতটা অনেক সময় ভুলে যায়। ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে যারা পারফেক্ট লাইফ দেখায়, তাদের দেখে অনেকেই নিজেকে কম মনে করে, আর এতে তৈরি হয় FOMO বা “Fear of Missing Out”। মানে, মনে হয় নিজের জীবনে কিছু না কিছু মিস হয়ে যাচ্ছে। এই নিয়ে মেন্টাল হেলথ এক্সপার্ট Jessica Holzbauer বলেন, যদি ঠিকভাবে গাইড না করা হয়, তাহলে সোশ্যাল মিডিয়া টিনএজারদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অনেক খারাপ হতে পারে।
তবে ব্যাপারটা একদমই নেতিবাচক না। সোশ্যাল মিডিয়ার ভালো দিকও আছে। ঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটা হতে পারে শেখার, কানেকশন তৈরির, আর নিজের ভাবনা শেয়ার করার একটা দারুণ মাধ্যম। অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের কথা, ট্যালেন্ট, আর পরিচয় প্রকাশ করতে পারছে, যেটা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে। আবার পড়াশোনা, নিউজ বা কোনো সামাজিক ইস্যু নিয়েও এখন সোশ্যাল মিডিয়া থেকে অনেক কিছু শেখা যায়। কেউ কেউ তো নিজের ক্যারিয়ার গড়ার জন্যও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছে, যেমন, স্কিল শেয়ার করা, মেন্টর খোঁজা, বা কাজের সুযোগ খোঁজা।
সবকিছু মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের যোগাযোগ আর শেখার পদ্ধতিকে বদলে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এর অপব্যবহার থেকে যে বিপদ হতে পারে, সেটা নিয়েও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। এই গবেষণা থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়া একেবারে বাদ দেওয়ার মতো নয়, বরং দরকার স্মার্ট আর ব্যালান্সড ব্যবহার। একটু বিরতি নেওয়া, অফলাইনে সময় কাটানো, আর নিজের মেন্টাল হেলথের খেয়াল রাখা খুব দরকার।
সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনের অংশ হয়েই থাকবে কিন্তু সেটাকে এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে যাতে সেটা আমাদের নিয়ন্ত্রণ না করে, বরং আমরা তাকে নিয়ন্ত্রণ করি।
———
Social media’s effect on today’s teenagers’ mental and physical health. Journal of Advanced Zoology (2023).
DOI: 10.53555/jaz.v44is8.3539
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


