প্রথমবারের মতো, বিজ্ঞানীরা টাইপ–১ ডায়াবেটিস আক্রান্ত এক রোগীর শরীরে CRISPR-এডিটেড অগ্ন্যাশয়ের কোষ প্রতিস্থাপন করেছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই কোষগুলো কয়েক মাস ধরে স্বাভাবিকভাবে ইনসুলিন উৎপাদন করেছে এবং এর জন্য রোগীকে কোনো ইমিউন-সাপ্রেসিভ ওষুধ খেতে হয়নি। এর কারণ, মৃত এক দাতার কাছ থেকে নেওয়া এই কোষগুলোকে জিন সম্পাদনার মাধ্যমে এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়েছিল যাতে রোগীর ইমিউন সিস্টেম এগুলোকে চিনতে না পারে।
এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছে সিয়াটল, ওয়াশিংটনভিত্তিক Sana Biotechnology। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তাদের এই পদক্ষেপ টাইপ–১ ডায়াবেটিসের জন্য এক স্থায়ী সমাধানের আশা জাগাচ্ছে। নিউইয়র্কের অ-লাভজনক সংস্থা Breakthrough T1D–এর সিইও অ্যারন কোয়ালস্কি বলেন, “এটা আমাদের কমিউনিটির জন্য এক বিশাল উৎসাহের বিষয় এবং অত্যন্ত চমৎকার এক পদ্ধতি।”
চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো স্টেম সেল ব্যবহার করে নতুন কোষ তৈরি করা, এরপর তাতে এমন জিন সম্পাদনা যুক্ত করা যাতে এগুলোও রোগীর ইমিউন সিস্টেম থেকে লুকিয়ে থাকতে পারে। ইতিমধ্যেই স্টেম সেল থেকে তৈরি ইনসুলিন–সিক্রেটিং কোষ পরীক্ষামূলকভাবে কিছু টাইপ–১ ডায়াবেটিস রোগীর মধ্যে সফলতার ইঙ্গিত দিয়েছে।
তবে, সবাই এই গবেষণার ফলাফল মেনে নিচ্ছে না। কিছু স্বাধীন গবেষকরা এখনো প্রমাণ পাননি যে Sana–র পদ্ধতি সত্যিই ইমিউন সিস্টেমকে ফাঁকি দিতে পারে। আরও বড় কথা, এই পরীক্ষাটি এখন পর্যন্ত শুধু একজন রোগীর ওপর করা হয়েছে এবং খুব অল্প কোষ ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে রোগী ইনসুলিন ইনজেকশনের পুরোপুরি স্বাধীনতা পাননি। ভ্যাঙ্কুভারের ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ার গবেষক টিম কিফার বলেন, “এখনো কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়নি।” তবুও তিনি একে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন।
বর্তমান চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা
টাইপ–১ ডায়াবেটিস রোগীরা বর্তমানে ইনসুলিন ইনজেকশন ছাড়া বাঁচতে পারেন কেবল ক্যাডাভেরিক (মৃত দাতার) কোষ প্রতিস্থাপন করালে। যদিও এটি কার্যকর, তবুও খুব কম ক্ষেত্রে করা হয়, কারণ উপযুক্ত দাতা পাওয়া কঠিন এবং প্রতিস্থাপনের পর আজীবন ইমিউন–সাপ্রেসিভ ওষুধ খেতে হয়, যেগুলোর মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে।
এই সমস্যার সমাধানে গবেষকরা স্টেম সেল–ভিত্তিক কোষ তৈরির দিকে ঝুঁকেছেন।
Vertex Pharmaceuticals (বোস্টন) ইতিমধ্যেই এমব্রায়োনিক স্টেম সেল থেকে তৈরি কোষ ১২ জন রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন করেছে। এক বছর পর দেখা গেছে, এর মধ্যে ১০ জনের আর ইনসুলিন ইনজেকশনের প্রয়োজন হয়নি।
চীনের Reprogenix Bioscience রোগীর নিজের চর্বির কোষ থেকে স্টেম সেল তৈরি করে তাতে সাফল্যের প্রাথমিক ইঙ্গিত পেয়েছে।
তবে এই দুই ক্ষেত্রেই রোগীদের ইমিউন–সাপ্রেসিভ ওষুধ খেতে হচ্ছে।
Sana–র “স্টেলথ” কৌশল
Sana–র মূল পরিকল্পনা হলো পুরোপুরি ওষুধ ছাড়াই কোষ প্রতিস্থাপন সফল করা। এজন্য তারা মৃত দাতার কোষ নিয়ে CRISPR–এর মাধ্যমে দুইটি জিন বন্ধ করেছে, যেগুলো সাধারণত কোষকে ইমিউন সিস্টেমের কাছে দৃশ্যমান করে তোলে। এরপর তারা কোষের মধ্যে CD47 নামক একটি প্রোটিনের নির্দেশনা যুক্ত করেছে, যা ইমিউন সিস্টেমকে বলে দেয়—“আমাকে আক্রমণ কোরো না।”
পরীক্ষার জন্য সুইডেনে এক রোগীর হাতে প্রায় ৮ কোটি সম্পাদিত কোষ প্রতিস্থাপন করা হয়। অল্প ডোজ হওয়ায় এটি নিরাপত্তা যাচাই হিসেবেই করা হয়েছিল। দেখা যায়, যেসব কোষে সব ধরনের জিন সম্পাদনা সম্পন্ন হয়েছিল, সেগুলো টিকে যায় এবং ১২ সপ্তাহ ধরে ইনসুলিন উৎপাদন করে। ফলো-আপ অনুযায়ী, এই কোষগুলো ৬ মাস পর্যন্ত সক্রিয় ছিল।
Sana–র সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং ট্রান্সপ্লান্ট বিশেষজ্ঞ সোনজা শ্রেপফার বলেন, “এই জিন-সম্পাদিত কোষগুলো আসলেই প্রতিস্থাপনের বাধা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম।”
ভবিষ্যতের দিক
ইয়েল ইউনিভার্সিটির ইমিউনোলজিস্ট কেভান হেরল্ড বলেন, এই ধরনের অগ্রগতি টাইপ–১ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করতে পারে। এটা হবে একবারের চিকিৎসা, যা ইনসুলিন উৎপাদন ফিরিয়ে দেবে, আর ইনজেকশন বা পাম্পের দরকার পড়বে না।
তবে, তিনি মনে করেন আসল সাফল্য আসবে যখন ইমিউন-ক্লোকিং সম্পাদনা ও স্টেম সেল থেকে তৈরি কোষ একসাথে ব্যবহার করা হবে।
Sana এবং Vertex ইতিমধ্যেই আগামী বছর থেকে এমন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পরিকল্পনা করছে। যদিও কিছু বিজ্ঞানী CD47 প্রোটিনের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দিহান, কিন্তু গবেষণায় সত্যিই যদি মানুষ সুস্থ হয়ে ওঠে, তবে এটি ডায়াবেটিস চিকিৎসায় বিপ্লব এনে দেবে।
———
Survival of Transplanted Allogeneic Beta Cells with No Immunosuppression. N Engl J Med (2025).
DOI: 10.1056/NEJMoa2503822
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


