[একই গবেষণাপত্রের ওপর বিজ্ঞানবার্তা এর আগেও একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে ২৯ জুন ২০২৫ এ। এখান থেকে দেখে নিতে পারেন।]
ধরুন, আপনি একটি জটিল লেখা লিখছেন। হঠাৎ ChatGPT-এর মতো একটি AI অ্যাসিস্ট্যান্ট পাশে এসে সাহায্য শুরু করল। মাথায় শব্দ খুঁজে পাচ্ছেন না, আর AI মুহূর্তেই সুন্দর করে বাক্য সাজিয়ে দিচ্ছে। প্রথমে মনে হতে পারে, কাজটা কত সহজ হয়ে গেল। কিন্তু গবেষণা বলছে, এই সহজ পথটি ধীরে ধীরে আপনার মস্তিষ্ককে একটি সূক্ষ্ম ঋণের ফাঁদে ফেলছে, যাকে বলা হচ্ছে cognitive debt বা মানসিক ঋণ। সহজভাবে বললে, সৃজনশীল বা বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে নিজে ভাবার বদলে AI-এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদে মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতা, স্মৃতি এবং মেধা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ক্ষতিকেই বলা হয় cognitive debt।
একটি গবেষণায় MIT, Harvard, Wellesley সহ বস্টনের পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪ জন শিক্ষার্থীকে তিনটি দলে ভাগ করা হয়। এক দল শুধু ChatGPT বা বড় ভাষার মডেল ব্যবহার করে লেখে। আরেক দল সার্চ ইঞ্জিনের ওপর নির্ভর করে। তৃতীয় দল কোনো ডিজিটাল সহায়তা ছাড়া শুধুই নিজের মস্তিষ্ক ব্যবহার করে লেখে। চার মাস ধরে চলা এই পরীক্ষায় EEG হেডসেট দিয়ে অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ রেকর্ড করা হয়। একই সঙ্গে লেখাগুলো বিশ্লেষণ করা হয় শব্দচয়ন, বিষয়বস্তু এবং মানুষের ও AI-এর মূল্যায়নের ভিত্তিতে। গবেষণাপত্রটি এখনও পিয়ার রিভিউড হয় নি।
ফলাফল বেশ চমকপ্রদ। যারা ChatGPT ব্যবহার করেছে, তাদের লেখার গতি দ্রুত হলেও মস্তিষ্কের নিউরাল সংযোগ তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে গেছে। যাঁরা শুধুই নিজের মস্তিষ্ক ব্যবহার করেছে, তাদের মস্তিষ্ক সবচেয়ে সক্রিয় ছিল। নিউরাল সংযোগ ছিল বিস্তৃত, আর মানসিক সম্পৃক্ততা ছিল সর্বোচ্চ। সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহারকারীরা ছিল মাঝামাঝি অবস্থানে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় দেখা যায় পরবর্তী ধাপে। যখন ChatGPT ব্যবহারকারীদের AI ছাড়া লিখতে বলা হয়, তখন তাদের মস্তিষ্কের নিউরাল সংযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল থাকে। এই অবস্থা মানসিক under-engagement বা কম মানসিক সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দেয়।
ভাষাগত দিক থেকেও বড় পার্থক্য ধরা পড়ে। LLM ব্যবহারকারীদের লেখা প্রায় একই ধরনের শব্দক্রম, বাক্যগঠন এবং বিষয়বস্তুর কাঠামো অনুসরণ করে। অন্যদিকে Brain-only গ্রুপের লেখা ছিল বেশি বৈচিত্র্যময়, স্বতন্ত্র এবং সৃজনশীল। এই পার্থক্য শুধু লেখার ভঙ্গিতে সীমাবদ্ধ নয়। স্মৃতির ওপরেও এর প্রভাব পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, LLM ব্যবহারকারীরা কিছুক্ষণ পর নিজের লেখা নিজেই মনে করতে পারে না। অর্থাৎ তারা নিজের কাজের সঙ্গে মানসিক সংযোগ হারিয়ে ফেলে। যদিও AI-এর লেখা ব্যাকরণ ও গঠনের দিক থেকে ঠিক থাকে, তবু তা প্রায়ই একঘেয়ে লাগে এবং AI-এর নিজস্ব লেখার ধাঁচ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গবেষকদের মতে, এই পুরো প্রক্রিয়াই ধীরে ধীরে একটি cognitive debt তৈরি করে। স্বল্পমেয়াদে কাজ দ্রুত শেষ হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সমালোচনামূলক চিন্তা, স্মৃতি এবং মানসিক সক্ষমতা কমতে থাকে। শিক্ষাক্ষেত্রে LLM ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু ব্যবহারকারীদের সক্রিয়ভাবে AI-এর সঙ্গে যুক্ত থাকার কৌশল শেখানো জরুরি। নইলে মস্তিষ্কের গভীর শেখার ক্ষমতা ক্ষয় হতে থাকে।
এখন ভাবুন, দৈনন্দিন জীবনে আমরা কত কাজ AI-এর হাতে তুলে দিচ্ছি। শুধু লেখা নয়, চিন্তাও। দ্রুত সুবিধার জন্য কি আমরা নিজের মস্তিষ্ককে ধীরে ধীরে অলস করে তুলছি? আজ এই ছোট ছোট cognitive debt চোখে পড়ছে না। কিন্তু কয়েক বছর পর আমাদের চিন্তাশক্তি, স্মৃতি আর সৃজনশীলতা আগের মতো থাকবে তো?
তাই AI-কে বন্ধু বানান, কিন্তু মালিক নয়। নিজের মস্তিষ্ককে নিয়মিত চ্যালেঞ্জ দিন। নিজে ভাবুন, নিজে চেষ্টা করুন। কারণ সৃজনশীলতা আর সমালোচনামূলক চিন্তা তখনই গড়ে ওঠে, যখন আপনি নিজে মানসিক পরিশ্রম করেন। ChatGPT আপনার লেখা সুন্দর করে সাজাতে পারে, কিন্তু আপনার চিন্তাকে শক্তিশালী করার দায়িত্ব আপনারই।
———
Your Brain on ChatGPT: Accumulation of Cognitive Debt when Using an AI Assistant for Essay Writing Task. arXiv:2506.08872 [cs.AI]
DOI: 10.48550/arXiv.2506.08872
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


