মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিভিন্ন অংশের মধ্যে যোগাযোগ বা ‘চ্যাটার’। এবার বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো এই মস্তিষ্কীয় যোগাযোগের নির্দিষ্ট ধরণগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যাটলাস বা ম্যাপ তৈরি করেছেন এবং দেখিয়েছেন, জন্ম থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত এই ধরণগুলো কীভাবে বদলায়।
এই গবেষণায় প্রায় ৩,৬০০ জন মানুষের মস্তিষ্কের স্ক্যান ব্যবহার করা হয়েছে, যাদের বয়স ১৬ দিনের নবজাতক থেকে ১০০ বছরের প্রবীণ পর্যন্ত। এতে ‘ফাংশনাল কানেক্টিভিটি’ নামে একটি বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যা মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সমন্বয়ের মাত্রা বোঝায়। গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণ বয়সে এই সংযোগের নির্দিষ্ট কিছু ধরণ বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী জ্যাকব সাইডলিটজ (যিনি এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন ন) বলেন এই ধরনের গাইড ভবিষ্যতে বিকাশজনিত সমস্যা বা স্নায়ুর ক্ষয়জনিত রোগ কখন শুরু হয় তা বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। গবেষণাটি গত ২৫ মার্চ, ২০২৬ Nature জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
মস্তিষ্কের ভেতরের সংযোগ বোঝা
মস্তিষ্ক সবসময় সক্রিয় থাকে। অনেক সময় দূরের দুটি অঞ্চল একসঙ্গে সক্রিয় হয়, যা ইঙ্গিত দেয় তারা একই কাজ সম্পন্ন করতে একসঙ্গে কাজ করছে। এদের বলা হয় ‘ফাংশনালি কানেক্টেড’, যদিও তারা শারীরিকভাবে কাছাকাছি নাও থাকতে পারে।
এই সংযোগগুলো কীভাবে সংগঠিত তা বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কের অঞ্চলগুলোকে বিভিন্ন স্কেল বা অক্ষ বরাবর সাজান। এই গবেষণায় তিনটি প্রধান ফাংশনাল অক্ষ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর একটি হলো ‘সেন্সরি-টু-অ্যাসোসিয়েশন’ অক্ষ, যা এমন একটি ধারাবাহিকতা দেখায় যেখানে এক প্রান্তে রয়েছে সংবেদন প্রক্রিয়াজাতকারী অঞ্চল, আর অন্য প্রান্তে রয়েছে জটিল চিন্তা ও তথ্য বিশ্লেষণে যুক্ত অঞ্চল।
এই অক্ষের মাঝামাঝি অংশে থাকা অঞ্চলগুলো সংবেদন ও জটিল চিন্তার মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ করে। ফলে তারা উভয় ধরনের নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে।
বয়সের সঙ্গে পরিবর্তন
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে জানতে চেয়েছেন, মস্তিষ্কের এই সংগঠন কীভাবে গড়ে ওঠে। ২০২২ সালে মস্তিষ্কের টিস্যুর একটি গ্রোথ চার্ট তৈরি হলেও ফাংশনাল কানেক্টিভিটির এমন পূর্ণাঙ্গ গাইড আগে তৈরি করা যায়নি।
এই গবেষণায় ৩,৫৫৬ জন মানুষের ফাংশনাল এমআরআই স্ক্যান বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা গেছে, তিনটি ফাংশনাল অক্ষই শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন পথে বিকশিত হয়।
উদাহরণ হিসেবে, সেন্সরি-টু-অ্যাসোসিয়েশন অক্ষের দুই প্রান্তের সংযোগের পার্থক্য শিশু ও কিশোর বয়সে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয় এবং প্রায় ১৯ বছর বয়সে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এই পরিবর্তন তরুণ মস্তিষ্ককে প্রাপ্তবয়স্কদের মতো সংগঠনের দিকে নিয়ে যায়।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হলো, যেসব তরুণের মস্তিষ্কের সংযোগের ধরন গড় মানের সঙ্গে বেশি মিল, তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক পারফরম্যান্স, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ গতি এবং স্মৃতিশক্তি তুলনামূলকভাবে ভালো।
অন্য একটি অক্ষ, যা মানসিক নিয়ন্ত্রণ ও তথ্যের মানসিক উপস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত, তা প্রাথমিক মোটর দক্ষতা বিকাশের সঙ্গে যুক্ত। এর মানে জীবনের ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে ভিন্ন সংযোগ প্যাটার্ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ভবিষ্যৎ গবেষণার দিক
মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী ম্যাক্সওয়েল এলিয়ট বলেন, এই অ্যাটলাস পুরো জীবনের জন্য মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম ধাপ। তবে এটি ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রতিটি মানুষের মস্তিষ্কের সুনির্দিষ্ট সংগঠন পুরোপুরি দেখাতে পারে না।
গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে সময়ের সঙ্গে মস্তিষ্কের নেটওয়ার্ক কীভাবে পরিবর্তিত হয় তা আরও নির্ভুলভাবে ট্র্যাক করা হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই প্যাটার্নগুলো কেমন ভিন্ন হয়, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।
———
Functional hierarchy of the human neocortex across the lifespan. Nature (2026).
DOI: 10.1038/s41586-026-10219-x
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


