ডেঙ্গু ভাইরাস ও অন্যান্য রোগ ছড়ানো স্ত্রী মশারাই আসলে সঙ্গমের সময় নিয়ন্ত্রণে থাকে, এমনটাই জানিয়েছে একটি নতুন গবেষণা, যা দীর্ঘদিনের “স্ত্রী মশা নিষ্ক্রিয় অংশগ্রহণকারী” ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
নিউইয়র্কের রকফেলার ইউনিভার্সিটির নিউরোবায়োলজিস্ট লেসলি ভশল ও তাঁর দল লক্ষ্য করেন, Aedes গণের পুরুষ মশারা প্রায়ই স্ত্রীদের পিছু নেয়, অথচ স্ত্রী মশা জীবনে মাত্র একবারই মিলন করে। “প্রশ্ন ছিল স্ত্রীরা ‘না’ বলে কীভাবে?” বলেন ভশল।
তাঁদের গবেষণায় প্রথমবার দেখা যায়, যখন কোনো পুরুষ Aedes মশা সঙ্গমের চেষ্টা করে, স্ত্রী মশা তার যৌনাঙ্গের অগ্রভাগ সামান্য বাড়িয়ে দেয়। যদি স্ত্রী এই সূক্ষ্ম অথচ গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত না দেয়, তবে পুরুষের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, মিলন ঘটে না।
মশার সঙ্গম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই শেষ হয় এবং সাধারণত আকাশেই ঘটে। এত ক্ষুদ্র অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যপ্রণালী বোঝা তাই এতদিন কঠিন ছিল। ভশল বলেন, “আগের বিজ্ঞানীরা হয়তো ভাবতেন, পুরুষই নিয়ন্ত্রণে।” কিন্তু তাঁর দলের এই আবিষ্কার মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে নতুন দিক খুলে দিতে পারে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Current Biology জার্নালে।
ফ্লুরোসেন্ট শুক্রাণু পরীক্ষায় নতুন তথ্য
ডেঙ্গু ছড়ানো প্রধান প্রজাতি Aedes aegypti-র মিলন প্রক্রিয়া বোঝার জন্য ভশলের দল জেনেটিকভাবে পরিবর্তিত পুরুষ মশা তৈরি করে, যারা সবুজ বা লাল ফ্লুরোসেন্টের শুক্রাণু উৎপন্ন করে। এরপর তারা স্ত্রী মশাদের সঙ্গে সাত দিন এক খাঁচায় রাখে। শেষে দেখা যায়, ৯০ শতাংশেরও বেশি স্ত্রী মশার দেহে এক রঙের শুক্রাণুই আছে অর্থাৎ, তারা জীবনে মাত্র একবারই সঙ্গম করে।
পরের ধাপে দলটি বিশেষ ক্যামেরায় সঙ্গমের দৃশ্য ধারণ করে। গবেষকেরা স্ত্রী মশাকে একটি ধাতব পিনে আটকান, যাতে সে ডানা ও পা নড়াতে পারে, কিন্তু উড়তে না পারে। এরপর উড়ন্ত পুরুষ মশাদের ছেড়ে দিয়ে তাদের যৌনাঙ্গের পারস্পরিক ক্রিয়া হাই রেজোলিউশনে রেকর্ড করা হয়।
ভশলের ল্যাবের গবেষক লিয়া হুরি-জিভি শত শত ঘণ্টা ধরে ভিডিওগুলো ফ্রেম বাই ফ্রেম পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি দেখেন, পুরুষ মশা সরাসরি যৌনাঙ্গ বাড়িয়ে দেয় না; প্রথমে সে স্ত্রী মশার যৌনাঙ্গে ছোট ড্রামস্টিকের মতো gonostyli দিয়ে টোকা দেয়। এই টোকায় সাড়া দিয়ে কুমারী স্ত্রী মশা তার যৌনাঙ্গ সামান্য বাড়ায়, যাতে মিলন সম্ভব হয়। কিন্তু আগেই সঙ্গম করা স্ত্রী মশারা সাধারণত যৌনাঙ্গ সঙ্কুচিত রাখে, ফলে মিলন ব্যর্থ হয়।
“এটা সত্যিই দারুণ, কারণ এতে যেন একটা ‘রিসেপ্টিভ কোড’ কাজ করে,” বলেন ব্রাজিলের ওসওয়ালদো ক্রুজ ইনস্টিটিউটের পতঙ্গবিশেষজ্ঞ নিল্ডিমার হনোরিও।
‘লক অ্যান্ড কী’ পদ্ধতি ও প্রজাতি বিলুপ্তির ইঙ্গিত
ভশল ও তাঁর সহকর্মীরা মনে করেন, এটি মূলত তালা-চাবির মতো এক প্রক্রিয়া যেখানে gonostyli হলো চাবি, যা স্ত্রী মশার যৌনাঙ্গ খুলতে সাহায্য করে। একই ধরনের প্রক্রিয়া তাঁরা Aedes albopictus প্রজাতিতেও পান, যা ৩৫ মিলিয়ন বছর আগে A. aegypti থেকে বিবর্তিত হয়েছে।
তবে তাঁরা আরও লক্ষ্য করেন, A. albopictus পুরুষ মশা A. aegypti স্ত্রী মশার প্রতিরোধ ব্যবস্থা পাশ কাটিয়ে মিলন করতে সক্ষম। “Aedes albopictus তার বড় gonostyli ব্যবহার করে Aedes aegypti স্ত্রী মশার যৌনাঙ্গ খুলে ফেলে এবং সঙ্গম সম্পন্ন করে,” বলেন ভশল।
ক্রেডিট: H. Amalia Pasolli, Anurag Sharma/The Rockefeller University
এ ধরনের আন্তঃপ্রজাতি মিলনে কোনো কার্যকর সন্তান জন্মায় না; বরং এতে স্ত্রী A. aegypti পরবর্তী মিলনের আগ্রহ হারায়। “যদি অনেক স্ত্রী মশার ক্ষেত্রে এটা ঘটে, তবে ওই প্রজাতিই বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে,” ভশল সতর্ক করেন।
এই পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝা বাস্তব জগতে জনস্বাস্থ্য বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আফ্রিকান উৎসের A. aegypti শত শত বছর আগে আমেরিকা ও ইউরোপে পৌঁছেছিল, কিন্তু A. albopictus (যা ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া উভয় ভাইরাসই ছড়াতে পারে) এসেছে মাত্র কয়েক দশক আগে। এখন অনেক জায়গায় দুই প্রজাতি একসাথে বাস করছে, এবং “A. albopictus ধীরে ধীরে A. aegypti-কে প্রতিযোগিতায় হারিয়ে দিচ্ছে,” বলেন ফ্রান্সের ট্যুরস বিশ্ববিদ্যালয়ের পতঙ্গবিশেষজ্ঞ ক্লাউদিও লাজারি। কারণ, A. albopictus পুরুষরা A. aegypti স্ত্রীদের সঙ্গে মিলন করে কার্যত তাদের ‘নিষ্ক্রিয়’ করে দিচ্ছে।
———
A rapidly evolving female-controlled lock-and-key mechanism determines Aedes mosquito mating success. Current Biology (2025)
DOI: 10.1016/j.cub.2025.09.066
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।



