পৃথিবীর সবচেয়ে ঠান্ডা বা শীতলতম স্থান হলো অ্যান্টার্কটিকার পূর্ব মালভূমি (East Antarctic Plateau)। এই অঞ্চলের কিছু নির্দিষ্ট উচ্চভূমি ও হ্রদ-আকৃতির নিম্নভূমিতে স্যাটেলাইট ডেটার মাধ্যমে রেকর্ড করা হয়েছে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে কম তাপমাত্রা যা প্রায় −৯৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ২০০৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে সংগ্রহ করা উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে।
তবে এই −৯৮°C ছিল বরফের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা, যা স্যাটেলাইট থেকে পরিমাপ করা হয়। বাস্তবে সেখানে বাতাসের তাপমাত্রা কিছুটা বেশি, তবে তখনও তা −৯৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর মতো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ক্রেডিট: Ted Scambos, NSIDC/University of Colorado-Boulder
এর আগে মানুষের দ্বারা সরাসরি পরিমাপকৃত সবচেয়ে কম বায়ুর তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিলো ২১ জুলাই, ১৯৮৩ সালে, রাশিয়ার Vostok স্টেশন‑এ যা ছিলো −৮৯.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে এক গবেষণা বলছে উপযুক্ত আবহাওয়া ও পরিবেশগত শর্ত পূরণ হলে রাশিয়ার ভোস্টক স্টেশনে তাপমাত্রা আরও কমে যেতে পারে। এমনকি সেখানে সম্ভাব্য রেকর্ড তাপমাত্রা হতে পারে মাইনাস –৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এই তীব্র মাত্রার শীতল পরিবেশে প্রাণী ও উদ্ভিদের অস্তিত্ব টিকে থাকার কোন সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবে এটিই কিন্তু আমাদের সোলার সিস্টেমের একমাত্র সবচেয়ে ঠান্ডা স্থান নয়।
অনেকে মনে করেন যে, সূর্য বা অন্য কোন নক্ষত্র থেকে সবচেয়ে দূরের বস্তু বা গ্রহেই হয়ত সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বিরাজ করে। যেমন, আমাদের সোলার সিস্টেমের শেষের অংশ কুইপার বেল্টে অবস্থিত বামন গ্রহ প্লুটোর পৃষ্ঠতলের গড় তাপমাত্রা প্রায় ৪১ কেলভিন বা –২৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, দূরবর্তী প্লুটোর থেকেও বেশি ঠান্ডা স্থান আমাদের উপগ্রহ চাঁদের বুকে লুকিয়ে রয়েছে।
২০০৯ সালে NASA-এর Lunar Reconnaissance Orbiter মিশনের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান যে, চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবস্থিত কিছু গর্ত, যেমন হারমাইট ক্র্যাটার (Hermite Crater)-এ সূর্যের আলো কখনোই পৌঁছায় না। এই গর্তগুলোর অভ্যন্তরে তাপমাত্রা হতে পারে প্রায় –২৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা প্রায় ২৬ কেলভিন। যা নিশ্চিতভাবেই প্লুটোর থেকেও অনেক বেশি শীতল স্থান বলা চলে।
ওর্ট ক্লাউড (Oort Cloud)-কে নাসা একদিকে আমাদের সৌরজগতের “সবচেয়ে দূরবর্তী অঞ্চল” হিসেবে বিবেচনা করে, আবার অন্যদিকে বলে এটি “সৌরজগতের বাইরের” অংশ। এই অস্পষ্টতার কারণে কখনো একে সৌরজগতের অংশ হিসেবে ধরা হয়, আবার কখনো একে সৌরজগত ও আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশের সীমানা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
যদি ওর্ট ক্লাউড কে সৌরজগতের অংশি হিসাবে ধরা হয় তাহলে আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে শীতল ও রহস্যময় অঞ্চল হচ্ছে ওর্ট ক্লাউড (Oort Cloud)। এটি সূর্য থেকে প্রায় ২,০০০–১,০০,০০০ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট (AU) পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে থাকতে পারে। এখানে গড় তাপমাত্রা প্রায় ৪.১৫ কেলভিন বা –২৬৮.১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা মহাবিশ্বের কসমিক ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশনের তাপমাত্রা (~২.৭ কেলভিন)-র কাছাকাছি অর্থাৎ হাইড্রোজেনের ফ্রিজিং পয়েন্টের প্রায় কাছাকাছি।
ক্রেডিট: NASA/JPL
যদি ওর্ট ক্লাউড কে সৌরজগতের বাইরে হিসাবে ধরা হয় তাহলে হয়তো চাঁদের হারমাইট ক্র্যাটার-ই হয়তো সৌরজগতের এখন পর্যন্ত রেকর্ডেট সর্বনিম্ন তাপমাত্রা।
তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো যে, সৌরজগতের বাহিরে আমাদের চীরচেনা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির ভেতরই এমন রহস্যময় স্থান রয়েছে, যাকে এখন পর্যন্ত প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান সবচেয়ে শীতল অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন বুমেরাং নীহারিকা (Boomerang Nebula)। এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৫,০০০ আলোকবর্ষ দূরে, Centaurus নক্ষত্রপুঞ্জে অবস্থিত।
এটি একটি প্রোটোপ্ল্যানেটারি নেবুলা এবং যার কেন্দ্রে একটি মৃতপ্রায় তারা তার বাইরের গ্যাস স্তর বিপুল বেগে ছুঁড়ে ফেলছে। ফলে নীহারিকাটির অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা পৌঁছে গেছে প্রায় –২৭২.১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ১৯৯৫ সালে NASA-র হাবল টেলিস্কোপ ও মাইক্রোওয়েভ ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারেন বিজ্ঞানীরা এবং পরবর্তীতের ALMA (Atacama Large Millimeter/submillimeter Array) থেকেও এটি নিশ্চিত করেন তাঁরা।
বুমেরাং নীহারিকা (Boomerang Nebula) প্রথম আবিষ্কৃত হয় ১৯৮০ সালে। দুইজন অস্ট্রেলিয়ান জ্যোতির্বিজ্ঞানী Keith Taylor ও Mike Scarrott চিলির লাস ক্যাম্পানাস অবজারভেটরি থেকে আকাশ পর্যবেক্ষণের সময় এই বিশেষ আকৃতির অতিশীতল নীহারিকাটি শনাক্ত করেন। তবে এটিকে প্রথমে এর অদ্ভুত, বুমেরাং-এর মতো গঠন দেখে এমন নাম দেওয়া হয়েছিল বুমেরাং নেবুলা।
তবে এটি হয়তো শেষ কথা নয়। ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষেরও বেশি বিস্তৃত আমাদের মহাবিশ্বে বুমেরাং নীহারিকার থেকেও ঠাণ্ডা কোনো অঞ্চল কোথাও লুকিয়ে থাকতে পারে। আজকের প্রযুক্তি দিয়ে হয়তো তা খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু বিজ্ঞানের অনুসন্ধান থেমে নেই। গবেষকরা নিরবিচারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, হয়তো একদিন পাওয়া যাবে নতুন কোনো “সর্বাধিক শীতল” বিস্ময়ের সন্ধান।
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।




