আমরা সবাই জানি বজ্রপাত মানেই বিদ্যুৎ চমক, বিকট শব্দ আর কখনো কখনো প্রাণঘাতী ঘটনা। কিন্তু ঠিক কীভাবে এই বজ্রপাত শুরু হয়? এই প্রশ্ন বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের কৌতূহলের বিষয় ছিল। গত ২৮ জুলাই, ২০২৫ Journal of Geophysical Research: Atmospheres-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এই রহস্যভেদের বড়সড় অগ্রগতি দেখিয়েছেন।
পেন স্টেট ইউনিভার্সিটির ভিক্টর পাসকোর নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, বজ্রপাতের সূচনা এবং ‘Terrestrial Gamma Ray Flashes’ (TGFs) নামে পরিচিত উচ্চ-শক্তির গামা রশ্মির উৎপত্তির পেছনে রয়েছে বায়ুতে ঘটে যাওয়া এক প্রকার ‘ফটোইলেকট্রিক ফিডব্যাক’।
কী সেই ‘ফটোইলেকট্রিক ফিডব্যাক’?
সাধারণভাবে, বজ্রপাত তখনই শুরু হয় যখন মেঘের মধ্যে বা মেঘ ও ভূমির মধ্যে বৈদ্যুতিক বিভব এতটাই বাড়ে যে তা বাতাসের মধ্য দিয়ে ইলেকট্রনের এক প্রকার অ্যাভাল্যাঞ্চ সৃষ্টি করে। এই ইলেকট্রনগুলো যখন বাতাসে থাকা নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন পরমাণুর সাথে সংঘর্ষ করে, তখন একধরনের উচ্চ-শক্তির এক্স-রে বা গামা রশ্মি নির্গত হয়। এই রশ্মিগুলো আবার বিপরীত দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং অন্য পরমাণুদের থেকে নতুন ইলেকট্রন ছিটকে বের করে আনতে সাহায্য করে আর এটাই হলো ‘ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট’।
এই প্রক্রিয়ায় একের পর এক নতুন ‘রানঅ্যাওয়ে ইলেকট্রন’ সৃষ্টি হয়, যা খুব দ্রুত বজ্রপাতের পূর্বশর্ত হিসেবে কাজ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রতিক্রিয়া এতটাই ক্ষুদ্র পরিসরে ঘটে যে তা প্রায় ১০০ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত শক্তিশালী বিকিরণ সৃষ্টির পরেও এর সাথে প্রায় কোনো আলো দেখা যায় না এবং তেমন রেডিও তরঙ্গও ধরা পড়ে না। এই কারণেই এগুলোকে বলা হয় “ডার্ক লাইটনিং”।
গবেষণার ফলাফল কী বলছে?
গবেষণাটিতে সময় নির্ভর সিমুলেশন করে দেখা হয়েছে, কীভাবে এই ফিডব্যাক মেকানিজম বজ্রপাত শুরুর জন্য যথেষ্ট শক্তি জোগায়। আরও দেখা গেছে, এই প্রক্রিয়াগুলো বিভিন্ন উচ্চতায় বিভিন্নভাবে আচরণ করে, অর্থাৎ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১১ বা ২২ কিলোমিটার উচ্চতায় এদের কার্যকারিতা ও প্রকৃতি ভিন্ন হয়।
এছাড়া, গবেষকরা জানান এই ফটোইলেকট্রিক ফিডব্যাক প্রক্রিয়াই একসাথে ব্যাখ্যা করতে পারে বজ্রপাতের সূচনালগ্নের Initial Breakdown Pulses (IBPs), Narrow Bipolar Events (NBEs), Energetic In-cloud Pulses (EIPs), এবং TGFs-এর মতো ঘটনা।
বিশেষত, এই গবেষণা দেখায় কীভাবে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে ফিডব্যাক লুপে জমে থাকা ইলেকট্রন হঠাৎ করে স্ট্রিমার গঠন করে, এবং সেটাই বজ্রপাতের সূচনা ঘটায়।
বজ্রপাত শুধু একটি দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি বিপজ্জনক এবং জটিল বৈদ্যুতিক প্রক্রিয়া। বজ্রপাতের সঠিক মেকানিজম জানা গেলে আগাম সতর্কতা জারি করা, মহাকাশ যান ও বিমানের নিরাপত্তা উন্নয়ন এবং উচ্চ শক্তির গামা বিকিরণের উৎস বুঝতে সাহায্য মিলবে।
এই গবেষণা শুধু একটি দীর্ঘদিনের প্রশ্নের উত্তরই দেয়নি, বরং বজ্রপাত ও গামা রশ্মি সম্পর্কিত ভবিষ্যতের গবেষণার পথও প্রসারিত করেছে।
———
Photoelectric Effect in Air Explains Lightning Initiation and Terrestrial Gamma Ray Flashes. JGR Atmospheres (2025).
DOI: 10.1029/2025JD043897
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


