পোড়া রোগীদের শরীর শুধু বাহ্যিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, এই ক্ষতের ভিতরেও বাসা বাঁধে প্রাণঘাতী জীবাণু। সম্প্রতি বাংলাদেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন রোগীদের পোড়া ক্ষত থেকে সংগ্রহ করা Pseudomonas aeruginosa নামক এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার বিস্ময়কর জেনেটিক এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের নেতৃত্বে পরিচালিত হয় এবং গবেষণাপত্রটি গত ১৫ জুলাই, ২০২৫ এ Scientific Reports এ প্রকাশিত হয়েছে।
এই গবেষণায় দেখা গেছে, ৮ মাসে ৯১টি পোড়া ক্ষত থেকে সংগৃহীত P. aeruginosa জীবাণুর মধ্যে ৬১টি ছিল এক্সটেন্সিভলি ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্স (XDR) এবং বাকি ৩০টি ছিল মাল্টিড্রাগ-রেজিস্ট্যান্স (MDR)। অধিকাংশ জীবাণু ছিল এমন ধরনের, যেগুলো প্রায় সব প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
গবেষকরা এসব জীবাণুর মধ্যে একাধিক বেটা-ল্যাকটামেজ উৎপাদনকারী জিন যেমন blaNDM-1, blaVIM-2, blaOXA-48 এবং blaPER-1 চিহ্নিত করেছেন। এই জিনগুলো অ্যান্টিবায়োটিককে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে, ফলে চিকিৎসা ব্যর্থ হয়। অধিকন্তু, ইন্টিগ্রন নামক জিনগত কাঠামোর উপস্থিতি এসব জিনকে একত্রে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, সবগুলো জীবাণু বায়োফিল্ম তৈরি করতে সক্ষম, যেটি একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষার আবরণ তৈরি করে। গবেষণায় pelB, pilT এবং rhlB নামক বায়োফিল্ম-সম্পর্কিত জিনগুলোর উচ্চ উপস্থিতিও লক্ষ্য করা গেছে।
দুইটি প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সম্পূর্ণ জিনোম বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখতে পান প্রতিটি জীবাণু অন্তত ২৮ থেকে ৫০টি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধী জিন বহন করে। পাশাপাশি, একাধিক Efflux Pump (যেগুলো জীবাণু কোষ থেকে ওষুধ বের করে দেয়) এবং Prophage (ভাইরাস থেকে সংক্রমিত জিন) এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এমনকি জীবাণুর জিনোমে ডিসইনফেক্ট্যান্ট প্রতিরোধী জিন (qacL, qacDelta1) পাওয়া গেছে, যা জীবাণুদের হাসপাতালের জীবাণুনাশক থেকেও রক্ষা করে।
গবেষণাটি একটি ভয়াবহ বাস্তবতা তুলে ধরে। বাংলাদেশের হাসপাতাল, বিশেষ করে বার্ন ইউনিটগুলোতে এমন অত্যাধুনিক জীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে, যা প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতির জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ। বিশ্বজুড়ে P. aeruginosa-এর সবচেয়ে ব্যাপকভাবে ছড়ানো সিকোয়েন্স টাইপ ST235, যা এই গবেষণাতেও লক্ষ্য করা গেছে। অর্থাৎ, এই জীবাণুর ধরন বাংলাদেশেও একইভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।
গবেষণাটি আমাদের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে যে, বাংলাদেশের মতো দেশে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ, উন্নত জীবাণু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও জেনেটিক পর্যবেক্ষণ এখন আর বিলাসিতা নয়—বরং স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য।
এই গবেষণার ফলাফল কেবল বিজ্ঞানীদের নয়, চিকিৎসা নীতিনির্ধারকদের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। যদি সময় মতো পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে হাসপাতালে চিকিৎসা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
———
Molecular and genomic insights into multidrug-resistant (MDR) and extensively drug-resistant (XDR) Pseudomonas aeruginosa causing burn wound infections in Bangladesh. Sci Rep (2025).
DOI: 10.1038/s41598-025-11614-6
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


