হান্টিংটন রোগ বা হান্টিংটন’স ডিজিজ (Huntington’s Disease) হলো এমন একটি শারীরিক অবস্থা, যা সময়ের সাথে সাথে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ সঠিকভাবে কাজ করা বন্ধ করে দেয়। এটি একটি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত রোগ, অর্থাৎ এটি একজন ব্যক্তির পিতামাতার কাছ থেকে আসে। সময়ের সাথে এটি ধীরে ধীরে খারাপ হতে থাকে এবং সাধারণত ২০ বছর পর মারাত্মক রূপ ধারণ করে। হান্টিংটন’স ডিজিজে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত তাদের রোগ নির্ণয়ের ১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে মারা যান। এতদিন এই রোগের কোনো কার্যকরী চিকিৎসা ছিলো না।
কিন্তু নতুন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে একবারের জিন থেরাপি হান্টিংটন রোগ (Huntington’s Disease)-এর গতি উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর করতে পারে, যা বিরল এই বংশগত মস্তিষ্কের রোগের চিকিৎসায় প্রথম কার্যকর পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।
২৯ জন প্রাথমিক পর্যায়ের রোগীর ওপর করা একটি ছোট্ট পরীক্ষায় দেখা গেছে, যাদের মস্তিষ্কে উচ্চ মাত্রায় থেরাপি প্রয়োগ করা হয়েছিল, তাদের রোগের গতি অন্যদের তুলনায় তিন বছরে ৭৫% পর্যন্ত ধীর হয়েছে।
নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে অবস্থিত জিন থেরাপি কোম্পানি uniQure জানায়, একাধিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে এ ফলাফল পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। গবেষকরা আরও লক্ষ্য করেছেন, থেরাপি নেওয়া রোগীদের স্পাইনাল ফ্লুইডে স্নায়ু ক্ষয় ঘটানো বিষাক্ত প্রোটিনের পরিমাণ কমেছে। এই সাফল্যের ভিত্তিতে আগামী বছর তারা চিকিৎসার জন্য অনুমোদন চাইবে বলে ঘোষণা করেছে।
ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির নিউরোলজিস্ট সান্দ্রা কস্টিক বলেন, “এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অগ্রগতি। ডেটাগুলো যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক।” তবে তিনি সতর্ক করে যোগ করেন, এটি এখনো প্রাথমিক ফলাফল এবং বৃহত্তর তথ্য প্রয়োজন।
প্রাণঘাতী জিনের পুনরাবৃত্তি
হান্টিংটন’স সাধারণত ৩৫–৫৫ বছর বয়সে শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে সমন্বয় ক্ষমতা ও স্মৃতিশক্তি কিছুটা দুর্বল হয়ে যায়, এরপর ধীরে ধীরে অনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া, হঠাৎ মেজাজ পরিবর্তন এবং চিন্তাশক্তি ক্ষয় হতে থাকে।
এ রোগের মূল কারণ হলো huntingtin নামক জিনে অতিরিক্ত DNA পুনরাবৃত্তি, যা একটি বিকৃত প্রোটিন তৈরি করে এবং তা মস্তিষ্ককে ধীরে ধীরে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত করে। এখনো পর্যন্ত কোনো চিকিৎসা সরাসরি মূল কারণকে লক্ষ্য করে তৈরি হয়নি; শুধু উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
জিন থেরাপির নতুন কৌশল
আগের প্রচেষ্টা ছিল antisense therapy, যেখানে DNA বা RNA-এর ছোট টুকরা ব্যবহার করে ত্রুটিপূর্ণ প্রোটিন উৎপাদন কমানোর চেষ্টা করা হয়। তবে ২০২১ সালে শেষ পর্যায়ের ট্রায়ালে এটি ব্যর্থ হয়। এরপর মনোযোগ ঘুরে যায় gene therapy–র দিকে, যা একবার প্রয়োগেই সমস্যাজনক জিনকে স্থায়ীভাবে নীরব বা সংশোধন করতে পারে।
uniQure-এর থেরাপি একটি নিরীহ ভাইরাসের মাধ্যমে microRNA নামক ক্ষুদ্র RNA কোষে পৌঁছে দেয়, যা ত্রুটিপূর্ণ huntingtin জিনকে ‘নীরব’ করে দিয়ে ক্ষতিকর প্রোটিন তৈরি বন্ধ করে। মস্তিষ্কে পৌঁছানোর পর ভাইরাসের কোড স্থায়ীভাবে থেকে যায় এবং কোষগুলো চিকিৎসামূলক microRNA উৎপাদন করে যায়।
এ থেরাপি প্রয়োগে দীর্ঘসময় ধরে অস্ত্রোপচার করতে হয়। চিকিৎসকেরা মস্তিষ্কের striatum অংশে ছোট ছিদ্র করে ধীরে ধীরে থেরাপি প্রবেশ করান। যদিও রোগীরা বড় কোনো সুরক্ষা সমস্যায় পড়েননি, তবে কিছু মাথাব্যথা, ব্যথা ও সার্জারিজনিত জটিলতা দেখা দিয়েছে।
একই ধরনের আরেকটি জিন থেরাপি প্রোগ্রাম শুরু করেছে Spark Therapeutics (Roche এর)। উভয় চিকিৎসার সম্ভাব্য খরচ প্রত্যেক রোগীর জন্য ১০ লক্ষ মার্কিন ডলারের বেশি হতে পারে, যা বৈশ্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বড় চাপ তৈরি করবে।
ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ
অনেক গবেষক মনে করছেন, ভবিষ্যতে CRISPR ও অন্যান্য gene-editing প্রযুক্তি স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে। তবে uniQure-এর থেরাপির মতো একটি চিকিৎসা যদি রোগের অগ্রগতি তিন-চতুর্থাংশ পর্যন্ত ধীর করতে পারে, তবে হান্টিংটন’স রোগকে প্রাণঘাতী জিনগত অবস্থা থেকে চিকিৎসাযোগ্য অবস্থায় নিয়ে আসা সম্ভব হতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অব সিনসিনাটির নিউরোলজিস্ট অ্যান্ড্রু ডুকার বলেন, “এটি একটি টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে।” আর ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির স্নায়ুবিজ্ঞানী কাইল ফিঙ্ক যোগ করেন, “এটাই প্রথমবার প্রমাণ করলো যে হান্টিংটন’স রোগকে ধীর করা সম্ভব। এটি আগামী প্রজন্মের চিকিৎসার পথ খুলে দেবে।”
নিয়মিত আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের নিউজলেটারে এবং ফলো করুন আমাদের টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার এবং ফেসবুক-এ। এছাড়াও যুক্ত হতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

এই নিবন্ধটি Creative Commons Attribution-NoDerivatives 4.0 International License-এর অধীনে লাইসেন্সকৃত। পুনঃপ্রকাশের জন্য পুনঃপ্রকাশের নির্দেশিকা দেখুুন।


